টিআইবির দাবি: অধ্যাদেশ বাতিলের যুক্তি আমলাতন্ত্র থেকে, নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব সক্রিয়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তনের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমলাতন্ত্র থেকেই এসেছে। তিনি সোমবার (৬ এপ্রিল) টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন।
অধ্যাদেশ কার্যকর না হওয়ার কারণ
ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, “অধ্যাদেশ আইন হিসেবে কার্যকর না হওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে, একটি আমলাতন্ত্র ও আরেকটি রাজনৈতিক প্রভাব।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ফল, যার উৎস রাজনৈতিক অঙ্গন, কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। তিনি বলেন, “এতে প্রমাণ হয়, এখনও দেশের নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
দুদকের অকার্যকারিতা ও নতুন কমিশনের দাবি
নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, “বর্তমান সময়টা দুদকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুদক কখনোই পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, তবে বর্তমানে নেতৃত্বের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি আরও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।” তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কমিশন না থাকায় নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। তিনি দ্রুত দুদকের নতুন অধ্যাদেশ সংশোধন ও নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানান।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের সমালোচনা
টিআইবি জানায়, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশনের প্রত্যাশা পদদলিত করা হয়েছে। সংগঠনটি বলছে, “অধ্যাদেশটিতে ‘স্বাধীন’ বা ‘নিরপেক্ষ’ শব্দ ব্যবহার না করে শুধুমাত্র একটি ‘সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।” এর গঠন, কার্যপরিধি ও প্রক্রিয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপি ও সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অধ্যাদেশের বিধান অনুযায়ী, পুলিশ কমিশন গঠিত হলে তা হবে সম্পূর্ণভাবে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশি ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যা মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। বিশেষ করে:
- সাবেক পুলিশ সদস্যকে সদস্য-সচিবের কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় অভূতপূর্ব।
- চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা তার অবসর পূর্বের সমরূপ করা হয়েছে, যা স্বাধীনতা খর্ব করে।
- সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটি আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে, ফলে সরকারের কর্তৃত্ব ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের সমস্যা
টিআইবি আরও উল্লেখ করে, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা একই সঙ্গে তথ্য আন্তঃপরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। এটি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে, কারণ কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রক ও সেবা দাতা উভয় ভূমিকায় থাকবে।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ আলোকে সব প্রকার উপাত্তের ব্যবস্থাপনা, আন্তঃপরিচালন এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হাতে অর্পণ করা হয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুযায়ী, এই ধরনের কর্তৃপক্ষ উপাত্ত সুরক্ষা আইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গঠিত হয়।
কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি দ্বারা বাছাই হবেন, যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকারের পছন্দ ও অনুগত লোকজন নিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। ফলে, তাদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে টিআইবি মত প্রকাশ করে।



