বিমানবন্দরে চাকরির নামে ব্যাপক প্রতারণা: হাজারো যুবক কোটি টাকা হারাচ্ছেন
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার অনার্স শিক্ষার্থী সবুজ রানা ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পান। সেখানে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লোডার পদে আকর্ষণীয় বেতনে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। বিস্তারিত জানতে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দেওয়া ছিল। সবুজ ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে তাকে বলা হয়, চাকরির জন্য একটি নির্ধারিত ফরম নিতে ৫০০ টাকা দিতে হবে। ফরম পূরণ করে পাঠানোর পর আরও ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে। মোট ৩ হাজার টাকা দিলে নিয়োগপত্র পাঠানো হবে এবং সরাসরি বিমানবন্দরে চাকরিতে যোগদান করা যাবে।
সবুজ ৩ হাজার টাকা পাঠানোর পর প্রথম দুদিন যোগাযোগ রাখতে পারলেও কয়েকদিন পর থেকে নম্বর বন্ধ পান। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারিত হয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু সবুজ নন, পাশের বাগমারা, মান্দা, নওগাঁ সদরসহ আশপাশের এলাকার কয়েক হাজার যুবক একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ হাজার করে টাকা নিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।
মৌলভীবাজার থেকে ২২ জন ভুক্তভোগীর করুণ গল্প
বুধবার (২ এপ্রিল) মৌলভীবাজার থেকে ২২ জন যুবক শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন ভুয়া নিয়োগপত্র নিয়ে। তারা জানতে পারেন, তাদের নিয়োগপত্র সম্পূর্ণ মিথ্যা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন কমলগঞ্জ উপজেলার আদকানি গ্রামের মো. আইন উদ্দিন মিয়া, তার স্ত্রী আমেনা বেগম, মুনসুর আলী, মজিব আলী, জিয়াউর রহমান, রুসমত আলী, আলাউদ্দিন মিয়া, সফুর মিয়া, মইনুল আলম, মাসরুর রহমান, আব্দুল হোসেন, সোহাগ আহমেদ, চেরাগ আলী, শাহ সাইদুজ্জামান, মো. আরকান আলী, শাহ মাহবুব, নাইম হোসেন, শিপন মিয়া, দেলোয়ার হোসেন, মো. জহির, হারুন মিয়া, খলিলুর রহমান ও কুতুব মিয়া।
তাদের অভিযোগ, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সৈয়দ শাহজাহান আহমেদ পলাশ ও তার সহযোগীরা তাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছেন। বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগের লেবার হিসেবে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল। সবার কাছ থেকে ২০-৩৫ হাজার টাকা জামানত এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৫-৭ হাজার টাকাসহ নানা অজুহাতে টাকা নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য: আশা ভঙ্গ ও আর্থিক ক্ষতি
ভুক্তভোগী নাইম হোসেন বলেন, "আমি দিনমজুরের কাজ করি। একটু ভালো থাকার আশায় বিমানবন্দরে কার্গোর লেবার হিসেবে চাকরির জন্য দালালের মাধ্যমে এসেছিলাম। বিমানবন্দরে আসার পরও শাহজাহান নামে ওই দালালের সঙ্গে কথা হয়। পরে সে আসছি বলে সব জায়গায় ব্লক এবং ফোন বন্ধ করে দিয়ে আর আসেনি। ওই দালাল আমাদের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা করে নিয়েছে। মেডিক্যাল পরীক্ষা, ভ্যাকসিন, ব্যাংক ড্রাফটের কথা বলে, ভ্যাকসিনের কার্ড বের করে দেওয়ার নানা অজুহাতে আমাদের কাছ থেকে এসব টাকা নেয়।"
আরেক ভুক্তভোগী আইন উদ্দিন মিয়া বলেন, "আমি বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হই। তখন শাহজাহানের সঙ্গে আমার কমলগঞ্জ থানার সামনে পরিচয় হয়। সে আমাকে টাকা তুলে দেবে বলেছিল। পরে ওই দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে গত মাসের ২৫ তারিখে টাকা তুলে দেওয়ার কথা বলেছিল। শাহজাহান আমাকে বলেছে, সে দীর্ঘদিন বিমানবন্দরে ঠিকাদারি করেছে। প্রতি বছর বিমানবন্দরে লেবার (শ্রমিক) নেয়। পরে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমাকে দিয়ে অনেক লোকজন জড়ো করে। একেকজনের কাছ থেকে ১০-৩০ হাজার টাকা করে নিয়েছে।"
প্রতিরোধ ও আইনি পদক্ষেপ
জানা গেছে, এসব ঘটনা নিয়ে প্রতারক চক্রের সন্ধানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে। বিমানবন্দরে চাকরি দেওয়ার নাম করে এর আগেও বহু প্রতারণার ঘটনা রয়েছে। অনেক সময় তারা গ্রেফতারও হয়েছে, কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও এ ধরনের প্রতারণায় যোগ দিয়েছে।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোবারক হোসেন বলেন, "প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা থানায় অভিযোগ দিলে বিষয়গুলো তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেন না। সে ক্ষেত্রে প্রতারকদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না। এসব বিষয়ে আসলে জনসচেতনতা প্রয়োজন। কোনটি সঠিক নিয়োগ বিজ্ঞাপন আর কোনটি ভুয়া, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে তারপর অগ্রসর হওয়া উচিত।"
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, "প্রতারকদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। আর যারা ভুক্তভোগী তাদের সচেতনতা হওয়া প্রয়োজন। একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখলে সেটা সত্য না মিথ্যা এগুলো জানা দরকার। প্রতারকরা নানা ফাঁদ পাতে। আমরা সচেতন হলে তাদের ফাঁদ কাজ করবে না। আগে আমাদের সচেতন হতে হবে।"
এই প্রতারণা শুধু রাজশাহী বা মৌলভীবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশজুড়েই ফেসবুক ও দালালদের মাধ্যমে বিমানবন্দরে চাকরির নামে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ভুক্তভোগীদের উচিত সচেতন হয়ে যেকোনো চাকরির বিজ্ঞাপন যাচাই করে অগ্রসর হওয়া এবং প্রতারণার শিকার হলে অবিলম্বে থানায় অভিযোগ করা।



