বাসসের সাবেক এমডির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তিনি নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাসে দেড় লাখ টাকা ভাড়ায় বাসসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করেছিলেন, যখন তিনি সংস্থাটির শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
গাড়ি ভাড়া বাবদ মাসে দেড় লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ
নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাহবুব মোর্শেদের মালিকানাধীন একটি টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি রেন্ট–এ-কার সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। এই গাড়ির জন্য সপ্তাহে সাত দিন ও চব্বিশ ঘণ্টা ভিত্তিতে মাসিক দেড় লাখ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মজার বিষয় হলো, একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গাড়ি বাসসে মাসে মাত্র সত্তর হাজার টাকা ভাড়ায় চলছে, যা প্রথম গাড়ির ভাড়ার অর্ধেকেরও কম। দ্বিতীয় গাড়ির চুক্তিতে অবশ্য সপ্তাহে সাত দিন ও চব্বিশ ঘণ্টার শর্ত উল্লেখ নেই।
রেন্ট–এ-কার সার্ভিসের মালিক আবদুল কাদের প্রথম আলোকে জানান, "একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি যদি ডেকে বলে যে এই গাড়িটা তোমার নামে চালাও, তখন আসলে আমার কিছু করার থাকে না।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত দেড় লাখ টাকার পুরোটাই মাহবুব মোর্শেদ নিতেন।
নিজেই নিজের বেতন-ভাতা নির্ধারণের অভিযোগ
বাসস সূত্রে আরও জানা গেছে, মাহবুব মোর্শেদ এমডি পদে নিয়োগের সময় তাঁর কোনো বেতন-ভাতা উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তীতে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি চুক্তিনামা তৈরি করে মূল বেতন নবম ওয়েজ বোর্ডের বিশেষ গ্রেডের সর্বোচ্চ সিলিং এক লাখ দুই হাজার তিনশত পঁচাত্তর টাকা নির্ধারণ করেন।
এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, ডেস্কভাতা, আপ্যায়নভাতা, দায়িত্বভাতা, চিকিৎসাভাতা যোগ করে মোট বেতন দাঁড়ায় এক লাখ আটানব্বই হাজার দুইশত আটত্রিশ টাকা। এছাড়াও তিনি পত্রিকা বিল, মুঠোফোন বিল, ইন্টারনেট বিল ও জার্নাল বিল বাবদ আলাদাভাবে মাসে প্রায় একুশ হাজার দুইশত টাকা ভাউচারের মাধ্যমে গ্রহণ করতেন।
বেতন-ভাতা নির্ধারণের পর যখন দেখা যায় যে তাঁর বেতন বাসসের কয়েকজন সাংবাদিকের চেয়ে কম, তখন তিনি বিশেষ ভাতা হিসেবে বেতনের সঙ্গে মাসিক বাইশ হাজার টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।
অননুমোদিত নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগ
নথিপত্র পরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাহবুব মোর্শেদ বাইশ জনকে স্থায়ীভাবে এবং একচল্লিশ জনকে খণ্ডকালীনভাবে নিয়োগ দেন। সংস্থার বিদ্যমান জনবলকাঠামোতে উল্লেখ নেই, এমন পদে কর্মীদের পদায়ন করে বিভিন্ন ভাতা প্রদানও করেছেন তিনি।
উদাহরণস্বরূপ, সিটি এডিটর এবং বাংলা সার্ভিসের চিফ রিপোর্টারের মতো পদগুলো বাসসের জনবলকাঠামোতে নেই। কিন্তু মাহবুব মোর্শেদের সময়ে সেসব পদে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি সংস্থায় নিয়োগ দিতে হলে আগে পদ তৈরি করতে হয়, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রক্রিয়া ও পদত্যাগ
মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিকে ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
মাহবুব মোর্শেদ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই বছরের জন্য বাসসের এমডি পদে নিয়োগ পান। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পরদিন বাসসে গিয়ে কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। তিনি ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন যে তাঁকে অপসারণের জন্য মব তৈরি করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে ১ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে। মাহবুব মোর্শেদের ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া ও বিল তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, "না, এ রকম কিছু ঘটে নাই" এবং পরে ফোন রেখে দেন।
বাসসের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে মাহবুব মোর্শেদের উত্তোলিত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বিল নির্ধারণের বিষয়টি সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ জানত না এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছেও বিষয়টি অজ্ঞাত ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি বলে জানা গেছে।



