ওয়ান ইলেভেনের জেনারেল মাসুদের গ্রেফতার: রাজনৈতিক প্রতিশোধ নাকি দুর্নীতির মামলা?
ওয়ান ইলেভেনের জেনারেল মাসুদের গ্রেফতার: প্রতিশোধ নাকি দুর্নীতি?

ওয়ান ইলেভেনের জেনারেল মাসুদের গ্রেফতার: রাজনৈতিক প্রতিশোধ নাকি দুর্নীতির মামলা?

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। বুধবার (২৫ মার্চ) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনউদ্দীন চৌধুরীর আদালতে এ আবেদন করেন।

এর আগে গত সোমবার রাতে সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আটক হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকেই ‘ওয়ান ইলেভেন’ ইস্যু সামনে এনে সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন। তাদের অনেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ করে সেজন্য তাকে দায়ী করছেন।

রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রশ্ন

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এ প্রশ্নও উঠছে যে, এ গ্রেফতারের মাধ্যমে বিএনপি ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নিতে শুরু করলো কী-না। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়টিই ‘ওয়ান ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ওয়ান-ইলেভেন সংক্রান্ত বই ‘এক-এগারো’র লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ওয়ান ইলেভেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময় যে কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, আর বিএনপি নিজেকে ওয়ান ইলেভেনের ভিকটিম মনে করে। এ কারণেই অনেকে মাসুদ চৌধুরীর গ্রেফতারকে প্রতিশোধ মনে করতে পারেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে। ফলে দেখতে হবে প্রকৃত অর্থে কী ধরনের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়।

ওয়ান ইলেভেনের পটভূমি

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন - এ ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকটের জের ধরে ব্যাপক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে মূলতঃ সশস্ত্রবাহিনীর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। তখন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার কথা থাকলেও তাকে ঘিরেই রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।

এক পর্যায়ে কে এম হাসান নিজেই দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানানোর পর আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এরপর বিরোধী দলগুলো এর প্রতিবাদে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা দেখা দেয়। এর এক পর্যায়ে সশস্ত্রবাহিনীর হস্তক্ষেপে পদত্যাগ করে জরুরি অবস্থা জারি করেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। দায়িত্ব নেয় ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা

ওই সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিল এবং সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। তবে, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তখনকার প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের প্রধান উপদেষ্টার পদ এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যদের পদত্যাগের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। ওই সময় আরও তিনজন সেনাকর্মকর্তা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। তারা হলেন - তখনকার নাইন ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তখনকার ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ফজলুল বারী ও তখনকার ডিজিএফআইয়ের আরেকজন কর্মকর্তা পরবর্তীতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এটিএম আমিন।

এর মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া অন্যদের কেউই দীর্ঘকাল ধরে দেশে নেই। যদিও ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেই ২০০৮ সালের জুনেই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে দুই বার তার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিল। যদিও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়ে দেশ ছাড়ার আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটকে ভূমিকা রেখে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।

গুরুতর অপরাধ দমন কমিটি

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি শপথ নেওয়া ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার সে বছরের আটই মার্চ তখনকার উপদেষ্টা এম এ মতিনকে চেয়ারম্যান এবং জেনারেল মাসুদ চৌধুরীকে প্রধান সমন্বয়কারী করে গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটির সিদ্ধান্তেই শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিককে তখন গ্রেফতার করা হয়েছিল। এমনকি তখন সারাদেশে যৌথ বাহিনীর কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে এই কমিটিও নির্দেশনাতেই।

তবে তারও আগে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনেও মাসুদ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে তখনকার সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ তার ‘শান্তির স্বপ্নে’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন। বইয়ের এক অংশে তিনি লিখেছেন যে তারা তখন প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য শুরুতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে রাজী হননি। ‘ড. ইউনূস অস্বীকৃতি জানানোর পর ড. ফখরুদ্দীনের নাম উঠে আসে। মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় যান এবং রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন গভীর রাত। আমি ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় ফোন করলাম। তিনি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমিও তাকে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে আমন্ত্রণ জানালাম’।

বিএনপির প্রতিক্রিয়া

মাসুদ চৌধুরীকে আটকের ঘটনার পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মঙ্গলবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ। ১/১১'তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেফতার শুরু করার জন্য’। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি নেত্রীকে আটক ছাড়াও তারেক রহমানকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। দলটির নেতাকর্মীরা তো মনে করেন এর পেছনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। সেজন্যই তার গ্রেফতারের পর বিএনপির লোকজন তার বিচার দাবি করছে কিংবা গ্রেফতারকে সমর্থন করছে। সব মিলিয়েই তার এই গ্রেফতার বেশ গুরুত্ব বহন করে।

তদন্তের লক্ষ্য

কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ অর্থ ও মানবপাচারের মামলার কথা বললেও রাজনৈতিক কারণেই কিংবা ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময়ে ভূমিকার জন্য মাসুদ চৌধুরীকে আটক করলো কী-না। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলামকে সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্ন করা হলেও তিনি শুধু বলেছেন, যেসব মামলা আছে সেগুলোই তারা তদন্ত করছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা ও সবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাটাই তাদের লক্ষ্য।

মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, এক এগারোর পর শেখ হাসিনা সরকার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পুরস্কৃত করেছিল বিভিন্নভাবে, তবে এখন তার আটক প্রতিশোধমূলক কী-না সেটি বলার মতো সময় এখনো আসেনি। তবে এটাকে কেন্দ্র করে এক-এগারো নিয়ে অনুসন্ধান হতে পারে। তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আছে। সরকার তদন্ত ঠিক মতো করলে হয়তো অনেক কিছু জানা যাবে।