ঢাকা ওয়াসায় সুশাসনের সংকট: অনিয়ম ও দুর্নীতির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা
ঢাকা ওয়াসা, রাজধানীর প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে নাগরিক ভোগান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিগত কোনো সরকারই এই সংস্থাটির সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি, ফলে নাগরিকদের অভিযোগ ও অসন্তোষ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
গোষ্ঠীতন্ত্রের প্রভাব ও শীর্ষ পদে রাজনৈতিক আনুগত্য
সম্প্রতি বছরগুলোতে ঢাকা ওয়াসায় একটি গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যেখানে শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও একশ্রেণির ব্যবসায়ী জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকসিম এ খান ওয়াসার এমডি হিসেবে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, এবং তাঁর মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও জবাবদিহির বদলে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
বর্তমান এমডি আবদুস সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন
বর্তমান এমডি প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, এবং তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে যে, কানাডার অন্টারিও রাজ্যের 'বেগম পাড়ায়' ওয়াসার এমডির স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। একজন সরকারি চাকরিজীবীর স্ত্রীর এই বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু এমডি দাবি করেছেন যে বাড়িটি তাঁর সন্তানেরা কিনেছেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণবিধি অনুযায়ী, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো সম্পদ অর্জন করতে হলে সরকারকে আগে জানিয়ে অনুমোদন নিতে হয়, এমনকি সন্তানদের কেনা সম্পদের ক্ষেত্রেও অর্থের উৎস উল্লেখ করতে হয়। তবে, আবদুস সালাম এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেননি; বরং প্রথম আলোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওয়াসা থেকে পাঠানো বিবৃতিতে কানাডায় বাড়ির তথ্য ও ছবি বানোয়াট বলে দাবি করা হয়েছে, যা সরকারি ওয়েবসাইটে মালিকানা তথ্যের বিপরীতে যৌক্তিক নয়।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও শর্ত সংশোধনের অভিযোগ
আবদুস সালাম বিগত বছরগুলোতে ওয়াসার তিনটি বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ কারণে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছিল। এমন পটভূমিতে তাঁকে ওয়াসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। গত বছরের নভেম্বর মাসে তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার সময় একাধিকবার বিজ্ঞপ্তির শর্ত সংশোধন করা হয়েছিল এবং তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল নিয়োগের যোগ্যতা অর্জনের জন্য, যা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
তদন্ত ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন যে, ওয়াসার এমডির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ওয়াসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এমডিকে জবাবদিহির মধ্যে আনা জরুরি, এবং তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তারও তদন্ত হওয়া উচিত। গোষ্ঠীগত স্বার্থ থেকে বের করে এনে ঢাকা ওয়াসাকে অবশ্যই নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যেখানে শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাই একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত।



