রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সড়কবাতি চুরি ও ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্টের অভিযোগে দায়ের করা একটি আলোচিত মামলায় দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খালাস পেয়েছেন। এখন তারা চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন রাসিকের প্রশাসকের কাছে।
মামলার পটভূমি
অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের সড়কবাতি সরবরাহকারী সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার আশরাফুল হুদা টিটোকে বাঁচাতে তৎকালীন সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। টিটো গত দুই বছর ধরে পলাতক।
ঠিকাদারের কার্যক্রম
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সড়ক আলোকায়নসহ রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের অধিকাংশ কাজ করত হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আশরাফুল হুদা টিটো তৎকালীন মেয়রের অতি ঘনিষ্ঠ হিসেবে আলোকায়নের সব কাজই পেতেন। তার কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের অন্য কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হতো না, এমনকি টেন্ডারেও অংশ নিতে পারতেন না অন্যরা।
নিম্নমানের বাতি সরবরাহ
চীন থেকে আনা প্রায় দেড় হাজার সড়কবাতি সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। দেখতে আকর্ষণীয় ও আলোকসজ্জা ভালো হলেও এসব বাতির ব্যালাস্ট ছিল অতি নিম্নমানের। ফলে স্থাপনের পরপরই বিকল হতে থাকে বাতিগুলি। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ ঠিকাদারের সব বিল আটকে দেন। এর ফলে তিনি ঠিকাদার টিটো ও সাবেক মেয়রের রোষানলে পড়েন।
মামলা দায়ের
২০২০ সালের ১৯ মে রাসিকের পক্ষ থেকে সড়কবাতি চুরি ও ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্টের অভিযোগে আরএমপির বোয়ালিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে সড়কবাতি পুড়িয়ে সিটি করপোরেশনের ক্ষতি করছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি আড়াল করতেই মামলাটি করা হয়।
আসামি ও বিচার প্রক্রিয়া
মামলায় প্রথমে সড়ক লাইট মিস্ত্রি মিজানুর রহমান শাহিন, উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল হাসান ও ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ইব্রাহিম হোসেনকে আসামি করা হয়। পরে অভিযোগপত্রে রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলাটি থানা পুলিশ ও পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গত ১৩ মার্চ রাজশাহী মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতের বিচারক আব্দুল কুদ্দুস আসামিদের খালাস দিয়ে রায় ঘোষণা করেন।
চাকরি পুনর্বহালের দাবি
মামলার আসামি গোলাম মোর্শেদ এ মামলা মাথায় নিয়ে অবসরে যান। তার পেনশন আটকে আছে। অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। রায়ে খালাস পাওয়ার পর তারা রাসিক প্রশাসকের কাছে চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, রায়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফ্লাডলাইট প্রকল্পে অনিয়ম
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীতে সড়কবাতি ও ফ্লাডলাইট স্থাপনে গুরুতর অনিয়ম ঘটে সাবেক মেয়রের আমলে। ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফ্লাডলাইট স্থাপনের প্রকল্পে চড়া দামে ফ্লাডলাইট কেনা হয়, যা চীন থেকে আমদানিকৃত বলে প্রচার করা হলেও আসলে তা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অকেজো ফ্লাডলাইট ছিল। ঠিকাদার টিটো সেগুলো কম দামে কিনে লেদে পরিষ্কার করে রাসিকে সরবরাহ করেন এবং বিপুল বিল আদায় করেন। বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী জানান, ফ্লাডলাইট প্রকল্পে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।



