ভবিষ্যতে যেন মেগা প্রকল্পের নামে মেগা ডাকাতি না হয়, সেই আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। রোববার (৩ মে) ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোট বিষয়ক জাতীয় কনভেনশনে তিনি এ কথা বলেন।
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ
সারজিস আলম বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে একটি লুটের রাজ্যে পরিণত করেছিল। তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদাহরণ টেনে বলেন, এই প্রকল্প রাশিয়ার রোসাটমের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এর জন্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একটি মার্কিনভিত্তিক ওয়েবসাইটের তথ্য উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, টিউলিপ সিদ্দিকীকে নেগোশিয়েটর হিসেবে রেখে শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং শেখ হাসিনার একটি সিন্ডিকেট প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যা বিদেশে পাচার হয়েছে।
আদানি চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জ
আদানি চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি ভারতীয় সাংবাদিক পরাঞ্জয় গুহ ঠাকুরতার লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য। এমনকি এই চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার ‘ফি’ হিসেবে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার দেওয়া হতো, বিদ্যুৎ কেনা হোক বা না হোক। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নীতিমালাও পরিবর্তন করা হয়েছে।
ঋণ ও অর্থ পাচারের চিত্র
ঋণের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সারজিস আলম বলেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যা আওয়ামী লীগের পতনের সময় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা— অর্থাৎ প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয়গুণ বৃদ্ধি। এই ঋণ পরিশোধ করতে আগামী ৪০ বছর লাগবে এবং প্রতিটি নবজাতকের মাথায় প্রায় দেড় লাখ টাকার ঋণ চাপানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিগত ১৬-১৭ বছরে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দিয়ে ৩৫-৪০টি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব ছিল। এমনকি পদ্মা সেতু প্রকল্পেও ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে লুটপাট
ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, সালমান এফ রহমান প্রায় ৭টি ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে লুটপাট চালিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যখন আমরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাই, তখন লুটপাটকারীরা দর্শক হয়ে বসে থাকে এবং আমাদের বিভাজন উপভোগ করে। তাই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং সেই খতিয়ান সামনে আনতে হবে।
সংস্কার ও সরকারের প্রতি আহ্বান
বর্তমান সরকারকে আহ্বান জানিয়ে সারজিস বলেন, ভবিষ্যতে যেন মেগা প্রকল্পের নামে মেগা ডাকাতি না হয়, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোনো ঠিকাদারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া না হয়। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, পাচার বন্ধ করতে হবে। আন্ডারটেবিল নেগোসিয়েশনই আজকের বড় সমস্যা, যা রাজস্ব কমিয়ে দেয় এবং সরকারকে বারবার ঋণ নিতে বাধ্য করে, দেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ, আমলাসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পলিসি মেকারদের, যারা দেশ পরিচালনা করেন। আমরা চাই বর্তমান সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্ব দিক এবং কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখুক। তারা যেন মনে রাখে জনগণ এখন সচেতন, যেকোনো অপচেষ্টা তারা প্রতিহত করবে। আমরা সবাই যদি সংসদ থেকে রাজপথ পর্যন্ত কণ্ঠস্বর ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখি, তাহলে ভবিষ্যতে আর কেউ বাংলাদেশকে বিপথে নিতে পারবে।



