ঢাকার ট্রাফিক সমস্যা মূলত সড়কের নয়, এটি একটি ভেঙে পড়া নগর শাসনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতি উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ট্রাফিক সিগন্যাল পুনরায় চালু করা, ভিআইপি মুভমেন্ট সীমিত করা এবং আইন প্রয়োগ জোরদারের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য। এই উদ্যোগগুলোর ফলে স্বল্প সময়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দৃশ্যমান হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদী উন্নতি ও তার সীমাবদ্ধতা
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি একসময় ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটারের নিচে নেমে এলেও সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ফলে ১৪ দিনের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ কিলোমিটারে। সংখ্যাটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য বড়। এটি দেখায়—সামান্য শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেও ট্রাফিক প্রবাহে উন্নতি সম্ভব। দীর্ঘদিন ধরে যে ধারণা প্রচলিত ছিল—ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর হবে না, কিন্তু বাস্তবতা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে এখানেই মূল প্রশ্ন, যদি সীমিত উদ্যোগে আংশিক উন্নতি সম্ভব হয়, তবে একটি কার্যকর সমন্বিত কাঠামো থাকলে কেন বড় পরিবর্তন আসবে না?
সমন্বয়হীন নগর শাসন
ঢাকার ট্রাফিক সমস্যাকে আমরা প্রায়ই সড়ক, যানবাহন বা জনসংখ্যার সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি মূলত একটি সমন্বয়হীন নগর শাসনের সমস্যা। একাধিক প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তব উন্নতির জন্য দায়বদ্ধতা ও কার্যকর সমন্বয় প্রায় অনুপস্থিত।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা
এ ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকার কথা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বাস্তবে এর ভূমিকা নীতিগত পরামর্শে সীমাবদ্ধ; বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ক্ষমতা ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো দুর্বল। বাস রুট রেশনালাইজেশন ও ‘নগর পরিবহন’ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল এই সংস্থার, যা বাস্তবায়িত করতে পারেনি। এতে স্পষ্ট হয়, সমস্যা ধারণায় নয়—সমন্বয় ও পরিকল্পনায়।
লাইসেন্সিং ব্যবস্থার ত্রুটি
অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সিং ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকলেও সেটি এখনো পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। লিখিত পরীক্ষায় বাস্তব সড়ক আচরণ ও ঝুঁকি উপলব্ধির চেয়ে যানবাহনের কারিগরি বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়, যা প্রকৃত চালনা দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। ফিল্ড টেস্ট থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পরিবেশে পরিচালিত হয়, যা বাস্তব সড়কের জটিলতা প্রতিফলিত করে না। একজন চালকের প্রকৃত সক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতিভিত্তিক রোড টেস্ট, যেখানে ট্রাফিকের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লেনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাইনেজ বোঝার দক্ষতা যাচাই করা যায়।
সিটি করপোরেশন ও পরিকল্পনার ঘাটতি
সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাস্তবে লেন মার্কিং অনেক স্থানে অনুপস্থিত বা অকার্যকর, সাইনেজ মানসম্মত নয় এবং পার্কিং জোন সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। ফলে সড়ক ব্যবহারে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হয় না। বিশেষ করে গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। নির্ধারিত বাসস্টপ থাকা সত্ত্বেও বাসগুলো প্রায়ই সড়কের বিভিন্ন স্থানে থামে। লোডিং জোন, ড্রপ-অফ জোন ও বাস-বে পরিকল্পিতভাবে নির্ধারিত না থাকায় সব ধরনের যানবাহন একই সড়কে অনিয়ন্ত্রিতভাবে থামে, যা সরাসরি ট্রাফিক প্রবাহকে ব্যাহত করে।
আইন প্রয়োগ ও জনআস্থা
এ বাস্তবতায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের আইন প্রয়োগ করতে হয় এমন পরিবেশে, যেখানে সাইনেজ বা নির্দেশনাই স্পষ্ট নয়। ফলে নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং আইন প্রয়োগের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগের অসামঞ্জস্য জন–আস্থাকেও প্রভাবিত করে। তবে এটাও উল্লেখযোগ্য যে অতীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং বন্ধ করে ইউটার্ন ব্যবস্থা চালুর মতো লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নির্দিষ্ট এলাকায় ইতিবাচক ফল দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, লক্ষ্যভিত্তিক ছোট উদ্যোগও সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই সমাধান তৈরি করতে পারে না। ট্রাফিক পুলিশের সীমিত জনবল দিয়ে প্রতিটি সড়কে নিয়মিত নজরদারি সম্ভব নয়। এ বাস্তবতায় সিটি করপোরেশনের অধীন পেশাদার পার্কিং রেঞ্জারস ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে, যা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
পরিকল্পনা ও প্রকৃত ব্যবহারের অসামঞ্জস্য
পরিকল্পনার ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) শহরের উন্নয়ন ও ভবন অনুমোদনের দায়িত্বে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এ অনুমোদন ট্রাফিক প্রবাহ, সড়কের ধারণক্ষমতা বা রোড অ্যালাইনমেন্ট বিবেচনা না করেই দেওয়া হয়। ফলে বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় পার্কিং সুবিধা থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রবেশ ও নির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে যানবাহন সড়কেই অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়, যা সরাসরি যানজট সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক নকশা ও বাস্তব ব্যবহারের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, যা চালকদের আচরণকে প্রভাবিত করে এবং সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে। এটি মূলত পরিকল্পনা ও প্রয়োগের মধ্যে কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতার প্রতিচ্ছবি।
প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর উদ্যোগ কিছু ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। তবে এটি একটি আংশিক সমাধান। কারণ, এটি মূলত মোড় নিয়ন্ত্রণ করে, পুরো শহর নয়। সরকার ইতিমধ্যে জিপিএস-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলছে, যা নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময়। তবে স্পষ্ট ব্যবহারিক লক্ষ্য, কার্যকর ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ছাড়া এই প্রযুক্তি বাস্তবে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না। ভবিষ্যতে এটিএস, আরটিএমএস, ড্রোন ও এলআইডিএআর-ভিত্তিক ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ এবং রিয়েল টাইম ডেটা বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এগুলো পরবর্তী ধাপ—মৌলিক সমন্বয় নিশ্চিত না হলে উন্নত প্রযুক্তিও প্রত্যাশিত ফল দেবে না।
উপসংহার
সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় শক্তিশালী না হলে এসব উদ্যোগের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না। এখানে কেবল কয়েকটি মূল সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। বাস্তবে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় অসংখ্য বড় ও ছোট ঘাটতি একসঙ্গে কাজ করছে এবং এই সমন্বয়হীন ব্যবস্থাই আজকের এই জটিল পরিস্থিতির মূল কারণ। এই লেখার লক্ষ্য সমাধান নির্ধারণ নয়, সমস্যার প্রকৃত কাঠামোকে স্পষ্ট করা। ঢাকার ট্রাফিক কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; এটি একাধিক দুর্বলতার সমষ্টিগত ফল। তাই একটি মাত্র দিক ঠিক করলেই সামগ্রিক উন্নতি হবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকার ট্রাফিক জট রাস্তায় নয়, জট লেগে আছে আমাদের ব্যবস্থার ভেতরে। সেই জট না খুললে, কোনো নতুন উদ্যোগই শহরকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারবে না। সমাধান শুরু হবে তখনই, যখন নীতিনির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগ একই কাঠামোর অধীন আসবে।
মাহমুদ রিয়াজ, যুগ্ম সচিব, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন



