বাংলাদেশে মাজার, খানকা ও দরবার শরিফে হামলার ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুরু হওয়া এই হামলার 'উৎসব' এখনো থামেনি। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে পীরের দরবারে পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
মাজার হামলার পরিসংখ্যান ও ভয়াবহতা
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশের ৬৫টি স্থানে ৬৭টি মাজার হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'মাকাম' বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে, যাতে ৩ জন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। এসব হামলার মধ্যে শুধু ভাঙচুর ও লুটপাটই নয়, লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা এবং পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও পরিকল্পিত হামলার কৌশল
হামলার পর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রায় ৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে মামলাই হয়নি। মাকামের প্রতিবেদন মতে, ৯৭টি মাজার হামলার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি; অর্থাৎ ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল। কুষ্টিয়ার ঘটনায়ও প্রথমে মামলা করা হয়নি, পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে মামলা হয়েছে।
প্রতিটি হামলাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা, মিটিং, মাইকে আহ্বান—সব কিছুই পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বুলডোজার বা ভেকু ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরিকল্পনারই নজির। 'মাকাম' তাদের প্রতিবেদনে ছয়টি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে যেখানে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও মব ভায়োলেন্সের ভিন্ন চিত্র
হামলায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। কুষ্টিয়ার হামলায় যাদের নামে মামলা হয়েছে, তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ভিডিও ফুটেজে ছাত্রদলের নেতাদের উপস্থিতিও দেখা গেছে।
মব ভায়োলেন্স সাধারণত স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিত হয়ে থাকে, কিন্তু মাজার হামলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। প্রথমে পরিকল্পনা, তারপর মব তৈরি করা হয় এবং শেষে মূল পরিকল্পনাকারীরা 'তৌহিদি জনতা'র মতো ব্যানারের আড়ালে নিজেদের চেহারা লুকিয়ে ফেলে।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
সরকারের নিষ্ক্রিয়তা হামলাকারীদের আরও সাহস জোগাচ্ছে। অথচ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া বা কার্টুন শেয়ার করার মতো বিষয়ে সরকারের কড়া নজর রয়েছে। হামলাকারীদের চেহারা স্পষ্ট থাকলেও পুলিশ যেন 'চোখ বন্ধ' করে রয়েছে। কুষ্টিয়ার ঘটনায় হামলার সামনের সারিতে থাকা ছাত্রদলের নেতাদের নাম মামলায় নেই এবং এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মাজার ও দরবার শরিফ হেফাজতে সরকারকে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে। গত দুই বছরের সব হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি চুপ থাকে, তাহলে পরোক্ষভাবে হামলাকে জায়েজ করে তোলা হয়।
সমাজের সব গোষ্ঠীর জীবন চর্চাকে সুরক্ষা প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই সহিংসতা সমাজে গভীর চিড় রেখে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাই সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।



