মশকনিধন শিখতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাধা, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন না পাওয়ার ঘটনা
মশকনিধন শিখতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাধা, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন না

যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ায় অবস্থিত ভ্যালেন্ট বায়ো সায়েন্সেসের একটি গবেষণাগার। মশকনিধনের ‘উদ্ভাবনী কার্যক্রম’ শিখতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তা। তাঁদের এই সফরের অর্থায়ন করার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মশকনিধনের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির। এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন করা ওষুধ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় কিনেছিল সিটি করপোরেশন। এটি মশার লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ। সাম্প্রতিক সময়ে একসঙ্গে এত টাকার মশার ওষুধ কোনো একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনার নজির নেই। তবে মেয়রসহ কর্মকর্তাদের এই সফরের অনুমোদন দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর মতামত

মশা নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই, দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে অবস্থান করলে মশা নিধনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব বলে অভিমত দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম, বিদেশ সফরের প্রস্তাব এবং ওষুধ কেনাকাটা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এই ধরনের সফরের মেয়রসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া যে কোম্পানির আমন্ত্রণে বিদেশ সফর, সে কোম্পানির ওষুধ কেনা হয়েছে আট মাস আগে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর অপ্রয়োজনীয়

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির আমন্ত্রণে ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল মেয়র ও কর্মকর্তাদের। কর্মকর্তারা হচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম। তাঁদের সঙ্গে থাকার কথা ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিনিধিদলের দেশে ফেরার কথা ছিল ১৬ জুন। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডা রাজ্যে ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির ল্যাব ও কারখানা পরিদর্শন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। চট্টগ্রামে এই ধরনের ল্যাব স্থাপনেও আলোচনা করার প্রস্তুতি ছিল প্রতিনিধিদলের। এ ছাড়া শিকাগো সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি ‘সিস্টার সিটি’ স্মারক সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে মেয়রসহ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয় অনুমোদনের জন্য। ওই সারসংক্ষেপ পাঠানো হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওই সফরের অনুমোদন দেননি।

মেয়রের বক্তব্য

বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেননি সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তবে গত মঙ্গলবার মেয়র বিবৃতিতে বলেন, ‘মশক নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, আমি তা সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছি।’

ওষুধ কেনা ও ব্যবহার শুরুর আট মাস পরে কেন বিদেশ সফর—এই ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ প্রকাশ্য মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিটিআই ওষুধ ব্যবহারের পর সুফল পাওয়া যাচ্ছিল। আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে তা ব্যবহারের চিন্তাভাবনা ছিল। এ জন্য এই সফরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।

তবে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই ধরনের বিদেশ সফরের কোনো প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই ধরনের বিদেশ সফর না করলে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে কোনো অসুবিধা হয়নি। যদি যেতেই হয় তাহলে প্রশিক্ষণ জাতীয় কর্মসূচিতে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীলরা যেতে পারেন।

আট মাস আগেই কেনা হয় ওষুধ

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে মেয়র ও কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ওষুধ সাড়ে আট মাস আগে কিনেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলের কাছ থেকে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিটিআই (বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) কেনা হয়। এটি মশার লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ। সাম্প্রতিক সময়ে একসঙ্গে এত টাকার মশার ওষুধ কোনো একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনার নজির নেই।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির ওষুধ এখানে বিক্রি করে থাকে প্রিমো হেলথ লিমিটেড। আবার প্রিমো হেলথের প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ওষুধ সরবরাহ করে ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলকে বিটিআই সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই কার্যাদেশের আওতায় ২ হাজার ২০০ ইউনিট ওষুধ কেনে সিটি করপোরেশন। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয় ১৬ হাজার ৫৪১ টাকা। এতে মোট ব্যয় হয় ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৯০ হাজার ২০০ টাকা।

পাউডারজাতীয় এই ওষুধের প্রতি ইউনিটে ৫০০ গ্রাম বিটিআই থাকে। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪০ লিটার পানিতে একটি ইউনিট মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করা হয়। পরে তা মশার প্রজননস্থলে ছিটানো হয়।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, গত বছরের ২৬ মার্চ নগরের বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ সড়ক এলাকার একটি খালে পরীক্ষামূলকভাবে বিটিআই লার্ভিসাইড প্রয়োগ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। এরপর গত ১ ডিসেম্বর থেকে মশা নিধনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিআই ব্যবহার শুরু করে সিটি করপোরেশন। তার আগে ২৯ নভেম্বর সিটি করপোরেশনে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে প্রিমো হেলথ লিমিটেড।

মশকনিধনে বরাদ্দ বাড়ছে, সুফল নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম নগরে মশার উৎপাত দীর্ঘদিনের সমস্যা। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, নালা-নর্দমায় পানি জমে থাকা, খাল-ডোবা পরিষ্কার না থাকা এবং নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস কার্যক্রমের ঘাটতির কারণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। নাগরিকদের অভিযোগ, মশা নিধনে সিটি করপোরেশন নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর দাবি করলেও অনেক এলাকায় কার্যকর ফল পাওয়া যায় না।

এ অবস্থায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মশকনিধন খাতে ব্যয়ের পরিমাণও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। সিটি করপোরেশন সর্বশেষ চার অর্থবছরে (২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬) মশকনিধন কার্যক্রমের জন্য ১৪ কোটি টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনেছে। এর মধ্যে মশা মারার অ্যাডাল্টিসাইড (পূর্ণবয়স্ক মশা মারার ওষুধ) কিনতে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। লার্ভিসাইড (লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ) কেনা হয়েছে ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকার। এই লার্ভিসাইডের মধ্যেই বিটিআইও রয়েছে। এ ছাড়া ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কিনতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর আগের চার বছরে (২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২) মশকনিধনে সাড়ে ২৪ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি ৩ লাখ টাকা।

মশকনিধন কার্যক্রমে ব্যয় বাড়লেও মশা কমেছে কি না, তার নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন নেই। চট্টগ্রাম নগরে কোন এলাকায় কী পরিমাণ লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, ওষুধ প্রয়োগের আগে ও পরে লার্ভার ঘনত্ব কতটা কমছে, কোন ওষুধ কতটা কার্যকর, কোন এলাকায় পুনরায় প্রজনন হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচের পরও নাগরিকেরা কার্যকর ফল পাচ্ছেন কি না, তা যাচাই করা কঠিন। ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩২৩ জন। গত বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন। তবে আগের বছরের তুলনায় গত বছর মৃত্যু কমেছে। ২০২৪ এ ৪৫ জন মারা গেলেও গত বছর মারা গেছে ২৭ জন।

স্বার্থের সংঘাত

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বিদেশ সফরের প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ওষুধ উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টাকায় বিদেশ সফর সরাসরি স্বার্থের সংঘাত। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে খুশি করে পরবর্তী কাজ পেতে এবং দ্রুত বিলের টাকা পাওয়ার জন্য এই ধরনের বিদেশ সফরের আয়োজন করে। এটি একধরনের উৎকোচ ও উপঢৌকন।

আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ঠিকাদার বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এক কাপ লাল চা খাওয়ারও সুযোগ নেই। কিন্তু সেখানে রীতিমতো বিদেশ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছে। এগুলো একধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রী এবার থামিয়েছেন। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের সফর চিরতরে বন্ধ হয়, তার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।