সাইপ্রাসে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এস আলমের সম্পদ জব্দের আদেশ
সাইপ্রাসে এস আলমের সম্পদ জব্দের আদেশ

সাইপ্রাসের পারেক্লিশিয়া এলাকায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম মাসুদ নামে বেশি পরিচিত) এবং তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন দেশটির আদালত। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অনুরোধের ভিত্তিতে নিকোশিয়া ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এ আদেশ দেন।

আদালতের আদেশ ও তদন্ত

এস আলমের বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে চলা একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর সম্পদ জব্দের অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে শুরু করা ‘পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রক্রিয়া’–এর মাধ্যমে অনুরোধটি করা হয়েছিল। সাইপ্রাসের অর্থ পাচারবিরোধী ইউনিটের (মোকাস) পক্ষ থেকে আবেদনের পর ১৯ মে সম্পদ জব্দের আদেশ দেন আদালত।

সাইফুল আলম তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এস আলম গ্রুপ ও সাইপ্রাসে নাগরিকত্ব

মোহাম্মদ সাইফুল আলম হলেন এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। তিনি ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ বা ‘বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব’ কর্মসূচির আওতায় দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। এটি ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ স্কিম নামে পরিচিত। সাইপ্রাসে আদালতের জব্দের আদেশে থাকা তাঁর সম্পদটি পারেক্লিশিয়া এলাকায় অবস্থিত একটি দ্বিতল আবাসিক ভবন।

তদন্তের বিস্তারিত

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশি তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানির একটি নেটওয়ার্কের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করছে। জালিয়াতি করে ঋণ নেওয়া, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের মতো অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাইপ্রাসে সম্পদ জব্দের আদেশের এক দিন পর বাংলাদেশি একটি আদালত মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তাঁর ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে ৫ মাসের কারাদণ্ড দেন। ঘটনাটি প্রায় ৬০ লাখ ইউরো সমমূল্যের একটি ঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এস আলম গ্রুপের এক সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে এ ঋণ দিয়েছিল।

বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩৪টি বাস কেনার জন্য এই অর্থ নেওয়া হয়েছিল। তবে সে বাসগুলো বাস্তবে কেনা হয়নি।

বহুমুখী তদন্ত

বাংলাদেশের তদন্ত শুধু এই মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাইপ্রাসের কাছে পাঠানো অনুরোধে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এস আলম–সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকও আছে।

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, ওই সব ঋণের অনেকগুলো পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এসব ঋণের অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে বলেছেন, এ ক্ষেত্রে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোরও বেশি অর্থ দেশ থেকে বাইরে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ মনে করছে, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলো সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্ক

সাইপ্রাসে নিবন্ধিত এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি কোম্পানির বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। এক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে কিনে নেওয়ার পর মোহাম্মদ সাইফুল আলম ২০১৬ সালে এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালকে অধিগ্রহণ করেছিলেন। কোম্পানিটি তদন্তাধীন অর্থের লেনদেনে ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা, তা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।

আদালতের নথিতে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং জার্সিতে থাকা একাধিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের কথাও উল্লেখ আছে। তদন্তকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো ও আর্থিক কার্যক্রম শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।

এস আলমের বক্তব্য

আইনি প্রতিষ্ঠান কুয়িন এমানুয়েলের আইনজীবীদের মাধ্যমে এস আলম বলেছেন, তাঁর সব বিনিয়োগ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে এসেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো অন্যায্য।

সাইফুল আলম বিনিয়োগসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিকারক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (আইসিএসআইডি) শরণাপন্ন হয়েছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর সম্পদের ওপর নেওয়া পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি লঙ্ঘন করছে।

গোল্ডেন পাসপোর্ট কর্মসূচি

মোহাম্মদ সাইফুল আলম সাইপ্রাসের ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরে সরকার এ কর্মসূচি বাতিল করে দেয়। তবে ওই নাগরিকত্ব কর্মসূচির কার্যক্রম পর্যালোচনাকারী কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নাম আসেনি।