রাজনৈতিক বা সরকারের সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর বর্বরোচিত হত্যার ঘটনায় তদন্ত শেষে পুলিশ মাত্র ছয় দিনের মধ্যে রবিবার (২৪ মে) আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে। ঘটনাটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয় আশা করছে আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচারকাজ শেষ হবে।
একটি সাধারণ ফৌজদারি মামলায় যেখানে চার্জশিট হতে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর লেগে যায়, সেখানে রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় এটি কীভাবে সম্ভব হলো এবং অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে কেন এমনটা নিয়মিত ঘটে না, সেই প্রশ্ন অনেকের।
রামিসা মামলায় যেভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো
রামিসা মামলায় থানা পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং ফরেনসিক বিভাগের মধ্যকার নজিরবিহীন সমন্বয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর নজরদারি এই দ্রুততম চার্জশিটের মূল কারণ। মূলত ৪টি স্তম্ভের ওপর ভর করে ছয় দিনে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
দ্রুত গ্রেফতার ও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি
ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পর একদিনের মাথায় আদালতের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে তার স্ত্রীর সহযোগিতার কথা আসায় তাকেও দ্রুত গ্রেফতার করা হয়।
ডিএনএ ও ফরেনসিক টেস্টের অসাধারণ গতি
সাধারণ মামলায় ডিএনএ ও ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে কয়েক মাস লেগে যায়। কিন্তু এই মামলায় আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে মাত্র ৩ দিনের মধ্যে সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করে এবং শনিবার (২৩ মে) বিকালে রিপোর্ট হস্তান্তর করে। এছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ থেকে দ্রুততম সময়ে রামিসার ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) রিপোর্ট সংগ্রহ করা হয়।
স্পেশাল পিপি ও ডেডিকেটেড টিম
এই মামলার জন্য একজন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ দেওয়া হয়। শনিবার রাতে ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই পুরো টিম রাত জেগে সব তথ্য একত্রিত করে রবিবার (২৪ মে) দুপুরের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট জমা দেয়।
অন্য মামলার ক্ষেত্রে কেন এমনটা হয় না
রামিসা মামলা প্রমাণ করে যে— সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত চার্জশিট সম্ভব। তবে সাধারণ মামলাগুলোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বড় সংকট বা প্রতিবন্ধকতা কাজ করে। প্রথমত, তদন্ত সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও কাজের চাপ। বাংলাদেশের থানাগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ডিউটি, প্রটোকল, ভিআইপি মুভমেন্ট এবং মামলার তদন্ত— উভয় কাজই একই পুলিশ কর্মকর্তাদের করতে হয়। একজন তদন্ত কর্মকর্তার কাঁধে একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব থাকে। ফলে রামিসা মামলার মতো চব্বিশ ঘণ্টা শুধু একটি মামলার পেছনে সময় দেওয়া তাদের পক্ষে বাস্তবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, ফরেনসিক ও মেডিক্যাল রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতা। বাংলাদেশে ফরেনসিক ল্যাব এবং ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। সারাদেশ থেকে আসা হাজার হাজার নমুনার জট লেগে থাকে ল্যাবগুলোতে। সাধারণ মামলায় একটি ডিএনএ বা ভিসেরা রিপোর্ট আসতে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ল্যাবের ক্লিয়ারেন্স না পাওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে পুলিশ চার্জশিট জমা দিতে পারে না।
তৃতীয়ত, আসামি সনাক্তকরণ ও গ্রেফতারের জটিলতা। অনেক মামলায় আসামি অজ্ঞাতনামা থাকে কিংবা ঘটনার পরপরই পালিয়ে যায়। প্রযুক্তিগত নজরদারি বা সোর্সের অভাবের কারণে আসামিকে গ্রেফতার করতেই মাসের পর মাস কেটে যায়। আসামি গ্রেফতার না হলে বা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি না দিলে ঘটনার সূত্র মেলাতে পুলিশকে দীর্ঘ সময় ধরে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী ধর্ষণের মামলার তদন্ত ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা মানা সম্ভব হয় না লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে। রামিসা মামলা প্রমাণ করেছে, যখন পুলিশ প্রশাসন, ফরেনসিক ল্যাব এবং বিচার বিভাগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একযোগে কাজ করে, তখন দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই অবিশ্বাস্য গতিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এটি যেন কেবল একটি ‘বিশেষ ঘটনা’ হয়ে না থাকে, বরং দেশের প্রতিটি ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে এই মডেলটি অনুসরণ করা উচিত।
ছয় দিনে চার্জশিট দেওয়া কীভাবে সম্ভব হয়েছে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাওয়া ও কঠোর নির্দেশনা, আসামির জবানবন্দি এবং ফরেনসিক ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টসহ সব প্রতিবেদন দ্রুত পাওয়ার কারণে এই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হয়েছে।”



