স্ত্রীর করা মামলায় ‘মৃত’ স্বামী থানায় হাজির, ফাঁস হল প্রতারণা
স্ত্রীর মামলায় ‘মৃত’ স্বামী থানায় হাজির, ফাঁস প্রতারণা

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিল চলাকালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে তার স্বামী নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে এক নারী মামলা করেন। পরে তার স্বামী থানায় এসে হাজির হয়ে জানান, তার অজান্তে স্ত্রী তাকে ‘মৃত’ দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে মামলা করেছেন। ঘটনাটি ঢাকার আশুলিয়ার।

মামলার বিবরণ

২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর কুলসুম বেগম (২১) নামের ঐ নারী তার স্বামীকে হত্যার অভিযোগ এনে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনকে আসামি করা হয়। পরে ৮ নভেম্বর ঢাকার আশুলিয়া থানায় তা এজাহারভুক্ত হয়।

কুলসুম বেগম এজাহারে উল্লেখ করেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ৫ আগস্ট সকালে তার স্বামী মো. আল আমিন মিয়া (৩৪) মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিকাল ৪টার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় বিজয় মিছিলে তিনিও ছিলেন। তবে পরাজয় মেনে না নিতে পেরে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচার গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার স্বামী নিহত হন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাদী কুলসুম বেগম আরও বলেন, অনেক খোঁজাখুঁজি করে তিনি স্বামীর সন্ধান পাননি। পরে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের ৬ আগস্টের এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারেন, এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা লাশ দাফন করেছে। এসব কাগজপত্র হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আছে। পরে তিনি হাসপাতালে থাকা কাগজপত্র, ছবি ও ভিডিও দেখে তার স্বামীর লাশ শনাক্ত করেন। আল আমিন সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পিরিজপুরের বাসিন্দা।

স্বামীর বক্তব্য

মামলা দায়েরের প্রায় দুই সপ্তাহ পর তিনি জানতে পারেন, তাকে ‘মৃত’ দেখিয়ে স্ত্রী মামলা করেছেন। মামলা থেকে আসামির নাম প্রত্যাহার করার কথা বলে নাকি তার স্ত্রী লোকজনের কাছ থেকে টাকাপয়সাও নিচ্ছেন। আল আমিন তখন মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলায় ছিলেন। বিষয়টির সত্যতা পেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে তিনি জুড়ী থানায় যোগাযোগ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আল আমিনের ভাই জাহাঙ্গীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, তার ভাইকে ‘মৃত’ দেখিয়ে ভাবি যে মামলা করেছেন সেটি জানতে পেরে তারা পুলিশকে জানান। পরে পুলিশের পরামর্শে তার ভাই আশুলিয়া থানায় যান।

আল আমিন জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে মেকানিকের কাজের সুবাদে তিনি স্ত্রীসহ জুড়িতে অবস্থান করছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটে। ৫ আগস্ট সে (স্ত্রী) আমার সঙ্গে সিলেটেই ছিল। এর তিন-চার দিন পর ঝগড়া করে মানিকগঞ্জে বাবার বাড়ি চলে যান। এরপর আর তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে জানতে পারি, আমি ৫ তারিখের (৫ আগস্ট) আন্দোলনে মারা গেছি উল্লেখ করে সে একটা মামলা করছে। ঐ মামলার একজন আসামি আমাকে ফোন দিয়া ঘটনাটি জানায়। এরপরই আমি পুলিশের কাছে যাই।

অবশেষে পুলিশ এই মামলায় তদন্ত শেষে আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।

আইনজীবীর বক্তব্য

অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, আমি একটা ঘটনা জানলাম, কেরানীগঞ্জে ১২ বছরের এক কিশোর মারা গেছে বলে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। আসলে ঐ কিশোর মারা যায়নি। তার পরিবারকে বলা হয়েছে, পালিয়ে থাকতে। ছেলেকে নিয়ে তার বাবা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন বহু ঘটনা আছে।

আরেকটি ভুয়া মামলা

একইভাবে জুলাই আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া এলাকার দুলাল হোসেন ওরফে সেলিম (৪৮) নামের এক ব্যক্তি। এই ঘটনায় তার বড় ভাই মোস্তফা কামাল যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এই মামলায় প্রধান আসামি শেখ হাসিনা। এছাড়া ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান কামাল, শামীম ওসমানসহ ৪১ জনের নামে এবং অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে। অথচ এই সেলিম কখনো ঢাকায় আসেননি। এমন মামলার কথা জানার পর তিনি ফুলবাড়িয়া থানায় হাজির হন। জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কা থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি।

জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম মো. সেলিম উল্লেখ থাকলেও এজাহারে বলা হয়েছে তার নাম দুলাল হোসেন ওরফে সেলিম। যদিও এলাকার লোকজন তাকে সোলায়মান সেলিম নামেই চেনেন। সেলিম বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি আতঙ্কের মধ্যে আছেন। তার সন্দেহ পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার ভাই সাজানো হত্যা মামলা দিয়ে থাকতে পারে। এ হত্যা মামলার বাদীর পাশাপাশি যে দুই জন সাক্ষী তারাও সেলিমের আপন ভাই হেলাল উদ্দিন ও আবুল হোসেন। তিন ভাইয়ের সঙ্গে সেলিমের ১৫০ শতাংশ জমি নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেলিম বলেন, তাদের সঙ্গে এই বিরোধ অনেক দিনের। মূলত আমারে মারার জন্যই এই মামলা করছে, জুলাই আন্দোলন উছিলা করে। এর মধ্যে আমারে মারতে পারলে এই মামলায় যারা আসামি তারা বিনা কারণে জেল খাটতো। এখন পর্যন্ত পাঁচ বার ঢাকায় এসে তিনি আদালত, থানা ও ডিবি কার্যালয়ে হাজির হয়ে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করেছেন।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার মামলায় ‘বাণিজ্য’

শুধু হত্যা মামলা নয়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার মামলায়ও ‘বাণিজ্যে’র অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট সুনামগঞ্জ পৌর শহরে গুলিবিদ্ধ হন মো. জহুর আলী। ঘটনার এক মাস পর তার বড় ভাই হাফিজ আহমদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় আসামি ধরা ও ছাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন গুলিবিদ্ধ জহুর আলী। নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে তিনি বলেন, পুলিশ আমারে গুলি করছে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করব। কিন্তু পরে দেখি মাসুম হেলাল সবাইরে মামলায় ঢুকাইয়া দিছে। এই মামলা নিয়া এখন ব্যবসা শুরু হইছে। সে (মাসুম হেলাল) কোটি টাকা নিছে। শুনছি সে এখন ক্যানাডা চইলা যাইব। টাকা নিয়ে জেলে ঢুকায়, বের করে। লোকজন বলে, আমরা টাকা নিচ্ছি। এটা মিথ্যা। আমরা কোনো টাকা পাই নাই। আমরা গরিব মানুষ। এখন আমরা পড়ছি মহাবিপদে।

মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ

এ ধরনের ভুয়া মামলা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন ইত্তেফাককে বলেন, জুলাই-আগস্টের মতো ঘটনাকে ম্লান করার একটা প্রচেষ্টা যখন একটা জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে মামলা করা হয়। একজন জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে তারই আত্মীয়স্বজন মামলা করছেন, এটি কল্পনার বাইরে। এটি সরাসরি জুলাই-আগস্টের শহিদদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী এলিনা খান ইত্তেফাককে বলেন, আন্দোলনের সময়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু ভুয়া মামলার কারণে সেই বিচারের পথও দুর্বল হয়ে যায়। প্রতিটি মামলার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। আমার মনে হয়, খুঁজে বের করতে হবে এখানে কারা কারা সত্যিকারের আসামি। যেমন দেশেই ছিল না তাদেরকেও এখানে জড়ানো হয়েছে। সেই জায়গাগুলোকে যদি বাছ করে তাহলে খুব দ্রুত মামলাগুলো নিষ্পত্তি হবে এবং যারা হয়রানির শিকার হচ্ছে তারাও এর থেকে নিষ্কৃতি পাবে। যারা এটার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদেরও বিচার করা উচিত।