জুন মাস এলেই একটা পরিচিত দৃশ্য তৈরি হয়। টেলিভিশনের পর্দায় বিশেষজ্ঞরা গলা ছেড়ে কথা বলেন। পত্রিকায় বড় বড় হেডলাইন। চায়ের দোকানে আলোচনা জমে ওঠে রাত পর্যন্ত। বাজেট ঘোষণার পর কয়েকদিন সরব থাকে সবকিছু। তারপর আস্তে আস্তে সব থেমে যায়। পরের বছর আবারও একই চক্র।
কিন্তু এই চক্রের বাইরে গিয়ে যদি সত্যিকার প্রশ্ন করা হয়— তাহলে উত্তরটা কী দাঁড়ায়? বাজেট কি আসলে সাধারণ মানুষের জীবন বদলাচ্ছে? রাজশাহীর একজন রিকশাচালক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন আমচাষি, নারায়ণগঞ্জের একজন গার্মেন্টকর্মী, তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাজেটের কোনও স্পর্শ আছে কি?
স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা
রাজশাহীতে কাজ করতে গিয়ে নিজের চোখে দেখেছি। জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ মাসের পর মাস শূন্য পড়ে আছে। যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, কিন্তু চালানোর লোক নেই। ওষুধ আসে মাঝে মাঝে, সরবরাহ বন্ধ থাকে মাঝে মাঝে। একজন সাধারণ রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছেন। সেই আসা-যাওয়ার খরচ, হোটেল, খাওয়া মিলিয়ে একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কয়েক মাসের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রতি বছর বাড়ছে, অথচ রাজশাহীর ওই হাসপাতালের ছবি বদলাচ্ছে না। এই দূরত্বটাই মূল সমস্যা।
আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সংখ্যাটা নিঃসন্দেহে বড়। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে কি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়? বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশের আশেপাশে, দক্ষিণ এশিয়ার গড় এর প্রায় দ্বিগুণ। এই দুর্বল রাজস্ব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বড় বাজেট মানেই বেশি ঋণ। আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই যাচ্ছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকিতে আরও প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই দুটো খাত মিলিয়েই বাজেটের বিশাল একটা অংশ আটকে যাচ্ছে। তাহলে উন্নয়নের জন্য, মানুষের জন্য, সড়কের জন্য, হাসপাতালের জন্য কতটুকু থাকছে?
ভর্তুকি কাঠামোতে সংস্কার জরুরি
ভর্তুকি কার কাজে লাগছে, সেই প্রশ্নটা তোলা দরকার। বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়, কিন্তু ঢাকার একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কারখানা এবং গ্রামের একজন দিনমজুর, দুজনেই ওই ভর্তুকির সুবিধা পাচ্ছেন। পার্থক্য হলো— কারখানামালিকের বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি, তাই তার প্রাপ্ত ভর্তুকির পরিমাণও অনেক বেশি। এই কাঠামো মূলত উল্টো। যে যত সম্পদশালী, ভর্তুকি তার কাছে তত বেশি যাচ্ছে। এটা ঠিক করতে হবে। ধাপে ধাপে জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। পরিবার কার্ড বা নগদ সহায়তার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারের হাতে টাকা দিলে সেটা অনেক বেশি কার্যকর হয়।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুণগত পরিবর্তন
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়েও একটু ভাবা দরকার। বর্তমানে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ নানা কর্মসূচি আছে। কিন্তু এই কর্মসূচিগুলোর তালিকা কতটা নির্ভরযোগ্য? অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তালিকায় এমন মানুষ আছেন— যিনি আসলে সুবিধার যোগ্য নন। আবার যোগ্য মানুষ তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন। এই গলদটা ঠিক না করলে বরাদ্দ বাড়িয়ে কোনও কাজ হবে না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপকারভোগীর তালিকা যাচাই এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি ভাতা প্রদান করলে মাঝের ফাঁকিটা অনেকটা বন্ধ হয়।
ছোট বিনিয়োগের বড় প্রভাব
উন্নয়ন বাজেট মানেই কি বড় সেতু আর মহাসড়ক? এই ধারণাটা পাল্টানো দরকার। অবশ্যই বড় অবকাঠামো দরকার। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একটা গ্রামীণ সড়ক যদি একজন কৃষককে সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে দেয়, একটা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যদি সপ্তাহে তিনদিন একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বসেন, একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি প্রশিক্ষিত শিক্ষক পাওয়া যায়, এগুলোও কিন্তু উন্নয়ন। আমার মতে, এই ছোট ছোট বিনিয়োগগুলোর প্রভাব মানুষের জীবনে সরাসরি এবং দ্রুত পড়ে। বড় প্রকল্পের সুফল পৌঁছাতে বছরের পর বছর লাগে, কিন্তু গ্রামের রাস্তা পাকা হলে সেদিন থেকেই মানুষ হাঁটতে পারে।
সড়ক ও যোগাযোগে বিনিয়োগের কথা উঠলে একটা সহজ প্রশ্ন করা উচিত। এই সড়কটা কতজন মানুষকে কাজের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে? ঢাকার ভেতরে একটা উড়াল সেতু হয়তো কয়েক হাজার গাড়ির যানজট কমাবে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের একটি জেলার সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপন করলে লক্ষাধিক কৃষক তাদের পণ্য দ্রুত ঢাকায় পাঠাতে পারবেন। মফস্বলের একজন উদ্যোক্তা কম খরচে কাঁচামাল আনতে পারবেন। অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এই মানদণ্ডে নেওয়া হলে জনগণের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ
কর্মসংস্থানের প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কাজের বাজারে আসছে। শুধু পোশাক খাতের ওপর ভরসা করে এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যাবে না। অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি-সেবা, লজিস্টিকস, পর্যটন, এমনকি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও কাজের সুযোগ তৈরির বিপুল সম্ভাবনা আছে। এই খাতগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে হলে নীতির স্থিতিশীলতা সবচেয়ে জরুরি। একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করার আগে জানতে চান, কর কাঠামো কাল হঠাৎ বদলাবে কিনা, অনুমোদন পেতে কত মাস লাগবে, মুনাফা ফেরত পাঠানো যাবে কিনা। এই নিশ্চয়তা দিতে পারলে বিনিয়োগ আসে, কাজ তৈরি হয়। বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, অর্থাৎ নতুন কর্মী নিয়োগ করলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর সুবিধা পাবে।
স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় কমানো
স্বাস্থ্য খাতে একটা তিক্ত সত্য আছে। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। মানে হলো, কেউ অসুস্থ হলে তার পরিবারকেই বেশিরভাগ খরচ বহন করতে হয়। এই খরচ একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে মাত্র একটা বড় অসুখে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করলে এই চাপ কমানো সম্ভব। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত চিকিৎসক নিশ্চিত করা এবং উপজেলা হাসপাতালে প্রাথমিক বিশেষজ্ঞ সেবা চালু রাখা, এগুলো অসাধ্য কাজ নয়। দরকার শুধু পরিকল্পিত বরাদ্দ এবং কড়া নজরদারি।
শিক্ষায় গুণগত বিনিয়োগের অভাব
শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো হয় ঠিকই। কিন্তু বরাদ্দের বড় অংশ চলে যায় ভবন নির্মাণে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে কতটুকু যায়? পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নে? জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে শেখার ঘাটতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। একটা শিশু পাঁচ বছর স্কুলে গিয়েও ঠিকমতো পড়তে পারছে না, এটা ভবন তৈরি করে বদলানো যাবে না। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা নিম্নদক্ষতার কাজে যাচ্ছেন বলে আয় কম, ঝুঁকি বেশি। প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ও গুণগত মান দুটোই বাড়াতে হলে ভাষা দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষায় বিনিয়োগের কোনও বিকল্প নেই। জার্মানি ও কোরিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শিল্প খাতকে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অংশ করলে কারিগরি শিক্ষার মান দ্রুত বদলে যায়।
ফলাফলভিত্তিক বাজেটের প্রয়োজন
ঐতিহ্যগত বাজেট প্রক্রিয়া থেকে বের হওয়াটা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর একই খাতে একই অনুপাতে টাকা ঢালা হয়। গত বছরের তুলনায় কত শতাংশ বাড়লো, সেটাই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু গত বছরের বরাদ্দে কতজনের জীবন বদলেছে, সেই হিসাব কেউ চায় না, কেউ দেয়ও না। এই ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহির অভাবটাই বাজেটকে বছরের পর বছর একই বৃত্তে ঘুরিয়ে রাখছে। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা পেলো সেটা জানা যায়, কিন্তু সেই টাকায় কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু টিকা পেলো, কত কিলোমিটার সড়ক টেকসইভাবে তৈরি হলো, সেই তথ্য সহজলভ্য নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টাও এবারের বাজেটে গুরুত্ব পাওয়া দরকার। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনও মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা অব্যবহৃত থাকছে। রুফটপ সোলার, কৃষিতে সৌরচালিত সেচ পাম্প, শিল্প এলাকায় সবুজ বিদ্যুতের সম্প্রসারণ, এগুলো একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাবে, অপরদিকে ভর্তুকির চাপও লাঘব করবে। সৌর প্যানেলে আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি করা এখন জরুরি।
রাজস্ব বাড়ানোর সৎ পথ
রাজস্ব বাড়ানোর কথা বলতে হলে সৎভাবে বলতে হবে। কর বাড়ানো মানেই সাধারণ মানুষের ওপর চাপ দেওয়া নয়। কর ফাঁকি কমানো, কর অব্যাহতির দীর্ঘ তালিকা পর্যালোচনা করা, সম্পদশালীদের ওপর কার্যকর কর আরোপ করা এবং কর প্রশাসনে ডিজিটাল পদ্ধতি জোরদার করাই আসল পথ। এতে রাজস্ব বাড়বে, কিন্তু সাধারণ মানুষের বোঝা বাড়বে না।
পরিবর্তনের নথি হতে পারে বাজেট
এবারের বাজেট নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণের পথ সহজ নয়। সীমিত রাজস্ব, উচ্চ সুদের চাপ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, এই বাস্তবতার মধ্যেই কাজ করতে হবে। তারপরও একটা সুযোগ আছে। বাজেটকে যদি সত্যিকারের ফলাফলের প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, যদি বলা যায়— এই বরাদ্দে কতজনের কাজ হবে, কতটা সড়ক তৈরি হবে, কতজন বিনা খরচে চিকিৎসা পাবেন, তাহলে বাজেট শুধু ঘোষণার দলিল থাকবে না। সেটা হবে পরিবর্তনের নথি।
রাজশাহীর সেই হাসপাতালের কথা আবার মনে পড়ছে। ওখানকার রোগীরা ঢাকায় আসতে চান না। তাদের দরকার কাছের একটা নির্ভরযোগ্য হাসপাতাল। এই একটা পরিবর্তনের জন্য বিশাল বাজেট লাগে না। লাগে সঠিক পরিকল্পনা, সৎ বাস্তবায়ন এবং ফলাফলের জবাবদিহি। বাজেটের সংখ্যাগুলো যদি সত্যিই মানুষের কাছে পৌঁছায়, তাহলে প্রতি বছরের এই প্রত্যাশার মৌসুমটা একদিন সত্যিকারের স্বস্তির মৌসুমে রূপ নেবে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক



