দুদকের অচলাবস্থা: সাড়ে তিন মাসে থমকে সব কার্যক্রম
দুদকের অচলাবস্থা: সাড়ে তিন মাসে থমকে সব কার্যক্রম

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিদিন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর কোনোটি অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যাচ্ছে না। নতুন মামলা হচ্ছে না, আদালতে জমা দেওয়া যাচ্ছে না অভিযোগপত্র। সম্পত্তি ক্রোক (জব্দ), বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা আসামি গ্রেপ্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ। চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের পর সাড়ে তিন মাস ধরে এমন অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।

কমিশন না থাকায় থমকে সব কাজ

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কমিশন না থাকায় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেমে আছে। প্রতিদিন পাঁচ-ছয়টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলো অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যাচ্ছে না। কারণ এতে কমিশনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল, সম্পত্তি জব্দ বা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আবেদনের ক্ষেত্রেও কমিশনের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু গত ৩ মার্চ কমিশনের তিন সদস্য একযোগে পদত্যাগ করার পর থেকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।

সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দুদক অকার্যকর থাকায় দুর্নীতিবাজেরা তাঁদের অবৈধ সম্পদ বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন। বিলম্বিত হওয়ার কারণে অনেক সময় মামলার আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এর সুযোগ নেন আসামিরা। এভাবে চলতে থাকলে দুর্নীতির ধারণাসূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান খারাপের দিকে যাবে। তাই শূন্য পদ দ্রুত সময়ের মধ্যে পূরণের দাবি জানান তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুদক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পরিবেশ সরকারই সৃষ্টি করেছে। ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন পুনর্গঠন করার বিষয়টিও সরকারের অজানা নয়। জেনে-বুঝে সরকার দুদককে স্থবির করে রেখেছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফায় দুর্নীতিবিরোধী যে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছিল, সেটি ফাঁকা বুলি মনে হচ্ছে। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার লোকদেখানো।

নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আইন অনুযায়ী কমিশন নিয়োগের জন্য আগে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করতে হয়। এ লক্ষ্যে ২ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারককে মনোনয়নের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। দুদকের একটি সূত্র জানায়, সার্চ কমিটির জন্য আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতিকে এরই মধ্যে মনোনীত করা হয়েছে। বাকি তিনজনকে দ্রুতই মনোনীত করা হবে। এরপর সার্চ কমিটি কাজ শুরু করবে।

গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলে জানান। তিনি এটিকে একটি ‘মধ্যবর্তী ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, আরও শক্তিশালী দুদক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন আইন করা হবে, সে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অচলাবস্থার প্রভাব

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কমিশন না থাকায় নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করা যাচ্ছে না। মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কমিশনের পদত্যাগের আগে যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়েছিল, সেগুলোর কিছু কাজ চলমান; কিন্তু বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে ফাইল প্রস্তুত হলেও কমিশন না থাকায় সেগুলো অনুমোদনের জন্য আর এগোচ্ছে না। এতে শত শত ফাইল আটকে আছে।

আইনে কমিশনের পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্ভব না হলে কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে নতুন কমিশন গঠনের পুরো প্রক্রিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক স্থবির রাখার মাধ্যমে বার্তা যাচ্ছে যে দুদক অকার্যকর আছে, তোমরা দুর্নীতি করো। দুর্নীতির লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। আরেকটা বার্তা যাচ্ছে—দুর্নীতি স্বাভাবিক ঘটনা, এর জন্য প্রতিষ্ঠানের কী দরকার। কেন কমিশন দেওয়া যাচ্ছে না, সে বিষয়ে একটি বক্তব্য সরকারের দেওয়া দরকার ছিল বলে মনে করেন তিনি।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, বিলম্বিত হওয়ার কারণে অনেক সময় মামলার আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এর সুযোগ নেন আসামিরা। এভাবে চলতে থাকলে দুর্নীতির ধারণাসূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান খারাপের দিকে যাবে। তাই শূন্য পদ দ্রুত সময়ের মধ্যে পূরণের দাবি জানান তিনি।