বাম ভোট বিজেপির জয়ের মূল চাবিকাঠি, 'এবার রাম পরে বাম' কৌশল
বাম ভোট বিজেপির জয়ের মূল চাবিকাঠি

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির অভাবনীয় জয়ের নেপথ্যে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বামপন্থিদের ভোট। আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত আদর্শের মনে হলেও, তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাম ভোটারদের একটি বড় অংশ পরিকল্পিতভাবে ‘পদ্ম’ শিবিরে ভোট দিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে এই কৌশল এখন ‘এবার রাম, পরে বাম’ স্লোগান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারীর স্বীকৃতি

৪ মে ভবানীপুর আসনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারীও এই অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। নিজের বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, ‘ভবানীপুরে সিপিএমের ১৩ হাজার ভোট ছিল, যার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ভোট আমার বাক্সে এসেছে। আমি সিপিএম ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

বাম কর্মীদের বক্তব্য

উত্তর ব্যারাকপুরের সঞ্জিত রায়ের মতো সিপিএম কর্মীরা সরাসরিই বলছেন, ‘আমাদের দল এখন অতটা শক্তিশালী নয়। তাই তৃণমূলকে হঠাতে আমাদের সমর্থকেরা বিজেপিকেই ভোট দিয়েছেন।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাম ভোট স্থানান্তরের কারণ

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর তৃণমূলের হাতে বাম কর্মীদের ওপর যে ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছিল, তা-ই বাম সমর্থকদের বিজেপির দিকে ঠেলে দেয়। সে সময় ঘরছাড়া ও কোণঠাসা বাম কর্মীরা বিজেপিকে এক ধরনের বাঁচার পথ হিসেবে গ্রহণ করেন। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের শাসনের অবসানের সময়ও সিপিএমের ভোট শেয়ার ছিল ৪১.০৯ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪.৪ শতাংশে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথমবার বামেরা কোনও আসন না পেলেও বিজেপির আসন ২ থেকে বেড়ে ১৮ হয় এবং ভোট শেয়ার ১৭ থেকে ৪০ শতাংশে পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বামেদের হারানো ২২ শতাংশ ভোট পুনরুদ্ধার করতে না পারা এবং সেই ভোট বিজেপির ঝুলিতে যাওয়াই আজ গেরুয়া শিবিরের এই জয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তৃণমূলের দমন-পীড়ন

২০১১ থেকে তৃণমূলের শাসনামলে বাম কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং দলীয় কার্যালয় দখলের ফলে তারা অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন। তাদের চোখে তৃণমূলই ছিল প্রধান শত্রু। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিয়াজ এবং অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, যখন বামপন্থিরা রাজপথে তৃণমূলের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন হিন্দু বাম ভোটাররা বিজেপিকেই একমাত্র শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে বেছে নেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর (সিএপিএফ) ব্যাপক মোতায়েন বাম ভোটারদের ভয়হীনভাবে ভোট দিতে সাহায্য করেছে। তারা বিশ্বাস করেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের ‘ভয়ের রাজত্ব’ শেষ হবে। বাম ভোটারদের কৌশল ছিল স্পষ্ট, আগে রামের (বিজেপি) সাহায্যে তৃণমূলকে হঠানো, তারপর নিজেদের শক্তি পুনরুদ্ধার করে আবার বামপন্থা ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচনোত্তর দৃশ্য

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেছে হারানো দলীয় কার্যালয় পুনরুদ্ধারের হিড়িক। অনেক জায়গায় স্থানীয় বিজেপি নেতাদের উপস্থিতিতেই বামেরা তাদের কার্যালয় ফিরে পাচ্ছেন। কোচবিহারের দিনহাটায় ফরওয়ার্ড ব্লকের কার্যালয় পুনরুদ্ধারের সময় বিজেপি নেত্রী পিয়ালী গুপ্তার উপস্থিতি ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত।

বামেদের ভবিষ্যৎ

তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বামেরা এখন বিরোধী দলের শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। যদিও ২০২৬ নির্বাচনে দীপশিতা ধর বা মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো তরুণ তুর্কিরা পরাজিত হয়েছেন, তবুও বামেদের মূল ভোট ব্যাংক (প্রায় ৬.৭ শতাংশ) এখনও অটুট। মুর্শিদাবাদের ডোমকল বা ভাঙড়ে বাম-আইএসএফ জোটের জয় সেই আশার আলোই দেখাচ্ছে।

উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের ধৈর্য প্রবাদপ্রতিম। তারা বামেদের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলকে ১৫ বছর সময় দিয়েছে। এখন বিজেপি সরকারের আমলে বামেরা আবার নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে কি না, নাকি অপ্রাসঙ্গিকতার বৃত্তেই বন্দি থাকে, সেটিই দেখার বিষয়। তবে আপাতত ‘এবার রাম, পরে বাম’ কৌশলে তৃণমূলকে হঠানোর তৃপ্তিই কাজ করছে বাম শিবিরে।