যশোরে বিএনপি আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার বিকেলে যশোর শহরের ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত এই সভায় তিনি দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমরা নিজেদেরকে সতর্ক রাখব, যাতে আর কেউ এই দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে। জনগণের শান্তি নষ্ট করে ১৭৩ দিন হরতাল করবে, সেই সুযোগ আমরা কাউকে দিব না।' তিনি আরও বলেন, 'বিভিন্ন রকম জুজু বুড়ির ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না, বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।'
বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা সম্পর্কে সতর্কতা
যারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়, তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়াবে, আমরা দেশ গঠনের কাজ করব। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ ১২ তারিখের নির্বাচনে ম্যান্ডেট আমাদেরই দিয়েছে। বিএনপি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালন করবে এবং একই সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে।'
নারীদের জন্য এলপিজি কার্ড ঘোষণা
জনসভা থেকে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি নারীদের রান্নার জন্য এলপিজি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, 'আমাদের মায়েরা-বোনেরা প্রতিদিন একটি কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। প্রতিদিন একটি যুদ্ধ তাদেরকে করতে হয় ঘরে, পরিবারের সকলের আহারের ব্যবস্থা করার সময় রান্নার ব্যবস্থা করতে হয়। এই রান্নার ব্যবস্থা করার সময় যে চুলা জ্বালাতে হয়, তার জন্য গ্যাস বা খড়ি যেটাই ব্যবহার করুক, এটি একটি সমস্যার কারণ। আমরা গত দুদিন আগে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি ইনশা আল্লাহ মায়েদের হাতে আমরা যে রকম ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছি, ঠিক একইভাবে সারা বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড যাদেরকে দিব, ঠিক সেই মাদের কাছে আমরা আরেকটি কার্ড দিব—সেই কার্ডটি হচ্ছে এলপিজি কার্ড, যাতে করে তাদেরকে আর রান্নার কষ্ট পোহাতে না হয়।'
মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করার ঘোষণা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান আরও বলেন, 'প্রথমবার ক্ষমতায় এসে আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া মেট্রিক পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করেছেন। আর আমরা এবার স্নাতক বা ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের ফ্রি লেখাপড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শুধু তা–ই নয়, যারা ভালো রেজাল্ট করবে, তাদেরকে উপবৃত্তি দেওয়া হবে।'
পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা
বিএনপির ওপর বাংলাদেশের মানুষের আস্থা আছে উল্লেখ করে তারেক রহমান জনসভায় আরও বলেন, 'আমরা গত কিছুদিন যাবৎ খেয়াল করে দেখছি এই দেশের কিছুসংখ্যক মানুষ আছে তারা একটি বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা আমাদের যে পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। যারা টিকিট বিক্রি করেছিল তারা যখন দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষকে সমর্থন দিয়েছে, বিএনপিকে ম্যান্ডেট দিয়েছে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করার জন্য, কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন করার জন্য, খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য, বন্ধ কলকারখানা চালু করে বেকারদের কর্মসংস্থান তৈরি করার জন্য। একদল লোকের এই ম্যান্ডেট পছন্দ নয় এবং সেই জন্যই তারা বলে বেড়াচ্ছে বিএনপি বলে ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে গিয়েছে।'
তারেক রহমান বলেন, '৫ আগস্টের পরে বিএনপি পরিষ্কার বলেছে জুলাই-আগস্ট মাসে যারা মানুষ হত্যা করেছে, তাদের আইনের বিচার হতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি ৫ তারিখের পরে কেউ কেউ বলেছিল আমরা সবাইকে মাফ করে দিলাম। যারা বক্তৃতার মঞ্চে জোরে জোরে কথা বলে, তাদেরকেই গিয়ে দেখেছি ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে ঢাকা থেকে অনেক দূরে গিয়ে মিটিং করতে।'
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর
যশোর মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বিষয়ে তারেক রহমান জনসভায় বলেন, ২০০৬ সালে প্রয়াত তরিকুল ইসলাম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যশোর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া সেই দাবি মেনে নেন। তখন যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপন কার্যক্রম শুরু হলেও গত ২০ বছরে হাসপাতাল স্থাপন হয়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সেই অসমাপ্ত কাজ এবার সমাপ্ত করছে।
যশোরের উন্নয়নে দাবি
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরের উন্নয়নে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, 'জনপ্রতিনিধি হিসেবে যশোরের মানুষের প্রতি আমার অনেক দায় রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি পারেন যশোরের মানুষের কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ করতে। যশোরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামে একটি সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। যশোরের ভবদহ অঞ্চলের কয়েকটি উপজেলার একটি বিস্তীর্ণ এলাকা সারা বছর পানির নিচে থাকে। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করা জনগণের দাবি। এ ছাড়া যশোর কৃষি প্রধান অঞ্চল। কৃষক তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন না। এ জন্য যশোরে একটি কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগার) স্থাপন সময়ের দাবি। জনগণের এসব দাবি আপনি বিবেচনা করবেন।'
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হকের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন।
সুস্থ জাতি প্রয়োজন
এর আগে আজ বেলা দুইটায় যশোর মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো মানুষকে অসুস্থ হওয়া থেকে দূরে রাখা। আমরা যদি দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই; তাহলে সুস্থ একটি জাতি প্রয়োজন।'
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'আমরা মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করব যাতে বড় বড় অসুখবিসুখ থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়। তা ছাড়া আমরা চেষ্টা করছি প্রাইভেট পার্টনারশিপ। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী থাকলে চিকিৎসার সুবিধা থেকে অনেককে বঞ্চিত হতে হয় বা হাসপাতালের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী সম্ভব হয় না। তাই যেটা করতে চাচ্ছি, প্রথম পর্যায়ে ভর্তি হওয়া এবং গুরুতর বিবেচনায় বেসরকারি হাসপাতালে রোগী প্রেরণ করা। সরকারের পক্ষ থেকেই আমরা সেই খরচ বহন করব।'
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক (সেবা) প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (শিক্ষা) অধ্যাপক নাজমুল হোসেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রেজাউল করিম প্রমুখ।
২০১৬ সালে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যশোরে মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলেও হাসপাতাল ছিল না। শিক্ষার্থীদের তিন কিলোমিটার দূরত্বে যশোর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ইন্টার্নশিপ ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতে হয়।
এর আগে যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী খালের পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ১৭৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। সবশেষে যশোর ঈদগাহ মাঠে জনসভায় বক্তৃতা দিয়ে সন্ধ্যার পর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।



