মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চর বলাকী গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১ জুন) দুপুরে সংঘটিত এই ঘটনায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় স্থানীয় বিএনপির কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বসতবাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
আহতদের পরিচয় ও চিকিৎসা
আহত ব্যক্তিরা হলেন—মুসা (৭০), সুমন (৩৫), জিকু (২৮), মুছা ও নুরুজ্জামান। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত সুমন ও জিকুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সংঘর্ষের পটভূমি
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক মুসার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক শহর আলীর বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের জেরেই সোমবার দুপুরে স্থানীয় ঈদগাহ এলাকায় মুসা ও শহর আলীর মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরে বিষয়টি দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
একপর্যায়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক উপজেলা যুবলীগ নেতা নাজমুল ইসলামের অনুসারী এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন প্রধানের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে হোসেন্দী ইউনিয়ন বিএনপির ৮ ও ৯ নাম্বার ওয়ার্ড কার্যালয়সহ অন্তত সাত থেকে আটটি বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মুসা বলেন, কয়েক মাস আগে শহর আলী ও তার ছেলে তাকে মারধর করেছিল। সোমবার দুপুরে ঈদগাহ এলাকায় তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি ওই ঘটনার মীমাংসার বিষয়ে জানতে চান। এ সময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। মুসা আরও বলেন, শহর আলী নিজেকে বিএনপির লোক দাবি করলেও তিনি মূলত যুবলীগ নেতা নাজমুল ইসলামের অনুসারী।
যুবদল নেতার অভিযোগ
এ বিষয়ে যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় যুবলীগ নেতা নাজমুল ইসলামের নেতৃত্বে তাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় পার্টি অফিস, তার বসতঘর এবং নুর ইসলাম, ইকবাল হোসেন, শুক্কুর আলী ও জিকুর বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রায় দুই শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এই হামলায় অংশ নেয়।
যুবলীগ নেতার অস্বীকৃতি
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগ নেতা নাজমুল ইসলাম বলেন, আনোয়ার হোসেনের লোকজন বিনা উসকানিতে তাকে ধাওয়া ও মারধরের চেষ্টা করে। পার্টি অফিস ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, তারা নিজেরাই নিজেদের স্থাপনায় ভাঙচুর চালিয়ে যুবলীগের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। নাজমুল ইসলামের মতে, এটি কোনো দলীয় বিরোধ নয়, বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধের ফল।
সিসিটিভি ফুটেজে হামলার চিত্র
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজন ব্যক্তিকে দেশীয় অস্ত্র হাতে আনোয়ার হোসেন প্রধান ও তার সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালাতে দেখা গেছে।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মুন্সীগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান আহমেদ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ব থেকেই গোষ্ঠীগত বিরোধ রয়েছে। এর আগেও তাদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটনায় কয়েকটি বাড়িঘর ও একটি রাজনৈতিক কার্যালয় ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। তিনি জানান, বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পূর্ববর্তী সংঘর্ষের ইতিহাস
উল্লেখ্য, এর আগে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর ও ৫ এপ্রিল একই গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন আহত হন এবং বহু বসতবাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।



