সরকারের ১০০ দিন: মান্নার মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা
সরকারের ১০০ দিন: মান্নার মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এরই মধ্যে সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কতটুকু কাজ করতে পেরেছে, কী কী ঘাটতি ছিল বা আগামী দিনে করণীয় কী, তা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। সরকারের দিনে তারেক রহমানের রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

প্রতিশ্রুতি পূরণ: ইতিবাচক দিক

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের ১০০ দিনে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাত প্রদান এবং কৃষকদের ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, "আসলে সরকারের সব কর্মসূচির ওপর আমার পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেই। যেমন, ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ মওকুফের কথা শুনেছি। সত্যিই যদি বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি ভালো খবর। আর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতার কথা প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এটা তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।"

কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, "এটা তো পর্যায়ক্রমে কয়েক বছর ধরে করবে। তাই এর মূল্যায়ন করবার সময় এখনই আসেনি। কারণ এ বিষয়ে কিছু সমালোচনাও আছে। মানে যার পাওয়া উচিত, তারা পেয়েছে কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। আবার পেয়েছে এরকমও শুনেছি। আমি মনে করি, এর জন্য খুবই প্রোপার একটা ডেটাবেজ লাগবে। সেটা কি আছে? ওনাদের (সরকারের) কেউ কেউ বলেছেন আছে। আবার কেউ কেউ জবাবটা এড়িয়ে গেছেন।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনশৃঙ্খলা: উদ্বেগ ও করণীয়

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মান্না বলেন, "সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মাথায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটেছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগের। খুন ও ধর্ষণ বেড়েছে। এর দুইটি দিক আছে। একটা রাজনৈতিক চরিত্র, আরেকটা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাটন।" তিনি উল্লেখ করেন, কিছু ঘটনা দলগতভাবে করা হয়েছে এবং পুলিশ মামলা নেয়নি। "সরকারের এগুলো মনিটর করা উচিত এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অনেকে মনে করেন, ক্ষমতায় যখন গেছি, তখন আমি নিজের সুবিধা আগে আদায় করে নিই। এ ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার কারণে আইনশৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।"

নারী নিপীড়নের হার বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সেটাও কঠোর হাতে দমন করতে হবে। কারণ অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে অ্যাসিড সন্ত্রাস ছিল ভয়াবহ। তবে তখন কিন্তু তারা বন্ধ করতে পেরেছিল। আমার বিশ্বাস, এখনও নারী-শিশু নির্যাতনের বিষয়ে সরকার কঠোর হলে, তাও নিয়ন্ত্রণে আসবে।"

আইন অঙ্গন: দলীয়করণের অভিযোগ

আইন অঙ্গন নিয়ে মান্না বলেন, "আইন অঙ্গনের অবস্থাও খুব একটা সঠিক পথে আছে বলে মনে হয় না। নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন চলতে থাকা বিচারের কোনও সুরাহা হয়নি। বিশেষ করে সাগর-রুনি হত্যা মামলার বিচার হবে, এমন প্রত্যাশার জায়গাও তৈরি হয়নি।" রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যা ইতিবাচক, তবে আরও মামলার বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত।

জুলাই সনদ ও বিরোধী দলের অবস্থান

জুলাই সনদ প্রসঙ্গে মান্না বলেন, "জুলাই সনদের প্রতিটি শর্তের নিচে লেখা আছে এ বিষয়ে কয়টি দল বিরোধিতা করেছে, কারা মতামত দেয়নি এবং কারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। মতপার্থক্যের কথা তো বলাই আছে। আবার এও উল্লেখ আছে, নোট অব ডিসেন্ট বা যাই থাকুক, কোনও দল তাদের ইশতেহারের পক্ষে ম্যান্ডেট অর্জন করলে তারা তাদের ইচ্ছে মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।" তিনি মনে করেন, বিরোধী দল এই পয়েন্টগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি এবং তারা সরকারকে খুব চাপ দেবে না।

দলীয় নিয়োগ: যোগ্যতা ও দলবাজি

বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন অঙ্গনে দলীয় নিয়োগের অভিযোগ সম্পর্কে মান্না বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন অঙ্গনে দলীয় লোক যদি যোগ্য হয়, তাহলে নিয়োগ দেবে না কেন? তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়, আইন অঙ্গন বা সিটি করপোরেশনে শুধু তাদের লোকগুলোই যোগ্য— এটা তো সঠিক না। দলের বাইরেও যোগ্য লোক আছে। এক্ষেত্রে কেউ যদি অভিযোগ করে এসব নিয়োগে একদম দলবাজি করা হয়েছে, সেটা একেবারেই অমূলক নয়।"

ব্যাংকিং সেক্টরের অস্থিরতা

ব্যাংকিং সেক্টরের অস্থিরতা নিয়ে মান্না বলেন, "ব্যাংকিং সেক্টরে অস্থিরতা হচ্ছে এটা সত্য। এর অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, সরকারের কাছে টাকা নেই। সামনে যে বাজেটটা দেবে— সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩০ কোটি টাকা। বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেওয়া হয়েছে। এটা সোজা কথা নয়।" তিনি সরকারকে পপুলিজম থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন এবং বলেন, "অন্যান্য অংশীজন ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সরকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারে। সহযোগিতা চাইতে পারে। কিন্তু সরকারের মধ্যে সেই ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তারা একদম একা চলছে।"

আওয়ামী লীগের তৎপরতা

আওয়ামী লীগের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে মান্না বলেন, "স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো স্পষ্ট করে বলেছেন, শেখ হাসিনা আইনি প্রক্রিয়ায় আসুক ও আত্মসমর্পণ করুক। তিনি ট্র্যাভেল পাস চাইবেন বলেছেন, এর পাশাপাশি ধমকের সুরে বলেছেন, তিনি আসবেনই। আমি মনে করি, ধমকাধমকি করে আসতে পারবেন না।" তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার ফিরে আসা বর্তমানে কঠিন এবং তারা নেতাকর্মীদের চাঙা করার জন্য এসব বলছেন।

সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক

সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে বোঝাপড়া আছে কিনা জানতে চাইলে মান্না বলেন, "দুই দলের আদর্শিক পার্থক্য ভিন্ন। তবে তাদের সম্পর্কে মৌলিক ব্যবধান খুব একটা আছে, এমনটিও মনে হয় না।" তিনি উল্লেখ করেন, এখন ক্ষমতার লড়াই বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে, এবং উভয় পক্ষই সংযত আচরণ করছে।

১০০ দিনের মূল্যায়ন

সরকারের ১০০ দিনের কাজে নম্বর দিতে বললে মান্না বলেন, "না আমি এখনই কোনও নম্বর দেবো না। আর জোর করেই যদি দিই, তাহলে বলবো ফিফটি ফিফটি। কারণ একটা সরকারকে ১০০ দিনে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার আরও ইতিবাচক ও গভীরভাবে মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে পরিচিত হবে এবং এগিয়ে যাবে।