বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: অর্জন ও চ্যালেঞ্জ
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: অর্জন ও চ্যালেঞ্জ

বহুল আলোচিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। সেই হিসাব অনুযায়ী বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হচ্ছে ২৮ মে। রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে ‘প্রথম ১০০ দিন’ কেবল একটি সময়সীমা নয়— এটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখার প্রথম পরীক্ষাগার।

প্রথম ১০০ দিনের গুরুত্ব

বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে। কারণ এই সময়েই জনগণ বুঝতে শুরু করে— পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা রূপ পাচ্ছে।

আমার লেখা ‘বিজয়ের রক্ষাকবচ’ গ্রন্থে, যা ধারাবাহিকভাবে বাংলা ট্রিবিউনে কলাম হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে প্রথম ১০০ দিনের গুরুত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলাম। বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন উদাহরণ— যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি, দক্ষিণ আফ্রিকার পুনর্মিলনের রাজনীতি, সিঙ্গাপুরের দুর্নীতিবিরোধী মডেল কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার ডিজিটাল স্বচ্ছতার উদ্যোগ— সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল: ক্ষমতায় এসেই জনগণকে দৃশ্যমান বার্তা দিতে হয় যে রাষ্ট্র কাজ করতে চায়, বদলাতে চায় এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে আন্তরিক।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিবাচক দিক

প্রথমেই ইতিবাচক দিকগুলো স্বীকার করতে হবে। সরকার অল্প সময়ে কিছু দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক ও জনমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কৃষিঋণ পুনর্বিন্যাস, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, খাল পুনঃখনন প্রকল্প, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনিটরিং সেল, গ্রামীণ সড়ক সংস্কার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় করার উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতাও দৃশ্যমান হয়েছে। অনেক এলাকায় বাজার তদারকি বৃদ্ধি এবং সেবা খাতে গতিশীলতা জনমনে কিছুটা হলেও আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকার অন্তত জনগণকে এই বার্তাটি দিতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা নিষ্ক্রিয় নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্লান্তির পর এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক অর্জন।

তৃণমূলের চ্যালেঞ্জ

কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু গতি যথেষ্ট নয়, সেই গতির গভীরতাও থাকতে হয়। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন তৃণমূল, সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও প্রায়শই সেই তৃণমূলই হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ রাজধানীর মন্ত্রীদের আচরণ দেখে সরকারকে বিচার করে না, তারা বিচার করে থানার সামনে দাঁড়ানো স্থানীয় নেতা, ইউনিয়নের প্রভাবশালী কর্মী কিংবা বাজারের বাস্তবতা দিয়ে। ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় মাঠপর্যায়ের আচরণগত সংকট।

বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারই কোনও না কোনোভাবে এই বাস্তবতার শিকার হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএনপিও সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে প্রথম ১০০ দিনে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। মফস্বল শহর, উপজেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলে এমন বহু অভিযোগ শোনা যাচ্ছে— কিছু তৃণমূল নেতাকর্মী ক্ষমতাকে জনসেবার পরিবর্তে প্রভাব প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রবণতা শুধু পৌরসভা বা গ্রামীণ জনপদেই সীমাবদ্ধ নয়, কোর্ট-কাচারির পরিবেশেও এর ছায়া দেখা যাচ্ছে।

অতি সম্প্রতি দিনাজপুর জেলা সদরে আমার এক আইনজীবী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে মাত্র দুই দিনেই কয়েকটি ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের কেউই বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষ ছিলেন না। অর্থাৎ সমস্যাটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চেয়েও গভীর, এটি ক্ষমতার সংস্কৃতিগত অপব্যবহারের সংকেত।

সতর্কবার্তা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

এখানেই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। কারণ জনগণ কখনো পুরো দলকে আলাদা করে দেখে না, তারা তৃণমূলের আচরণ থেকেই সরকারের চরিত্র নির্ধারণ করতে শুরু করে। একটি রাজনৈতিক দল কেন্দ্রে যত উন্নত চিন্তাই ধারণ করুক না কেন, মাঠপর্যায়ে যদি কর্মীদের আচরণ পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটায়— তাহলে সেই সরকারের নৈতিক উচ্চতা দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়।

বিজয়ের রক্ষাকবচ গ্রন্থে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলাম—ক্ষমতায় গিয়েই প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ‘আচরণগত সংস্কার’ শুরু করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা সহজ, কিন্তু নিজের দলের সংস্কৃতি পরিবর্তন করাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা। সেই জায়গায় বিএনপি সরকারকে এখনই কঠোর হতে হবে এবং সুস্পষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কিংবা বিচারপ্রার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ‘জিরো টলারেন্স’ না দেখাতে পারলে সরকারের ইতিবাচক অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা করলেই হবে না, নিজ দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণ এখন ভাষণের চেয়ে উদাহরণ দেখতে চায়।

গভীরতার প্রয়োজন

একইসঙ্গে সরকারকে বুঝতে হবে, প্রথম ১০০ দিনের সাফল্য মূলত গতি প্রদর্শনের সাফল্য। কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে দরকার গভীরতা— প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সরকার এখনও মূলত ক্ষত সামলানোর পর্যায়ে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের চাপ পুরোপুরি কমেনি, বিনিয়োগের পরিবেশ এখনও সতর্ক অবস্থায় এবং সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। ফলে আগামী সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রতীকী উদ্যোগকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা।

উপসংহার

তবে সব সমালোচনার মধ্যেও একটি বিষয় অস্বীকার করা যাবে না— এই সরকার অন্তত রাষ্ট্রকে সচল করার একটি প্রাথমিক গতি দেখিয়েছে। এখন সেই গতিকে সুশাসন, রাজনৈতিক সংযম এবং আচরণগত সংস্কারের ভিত্তিতে গভীরতায় রূপ দিতে পারলেই তা দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ বহু সরকার দেখেছে। তারা এখন শুধু নতুন মুখ চায় না, নতুন রাজনৈতিক আচরণ চায়। আর ইতিহাস বলে, একটি সরকারের প্রকৃত বিজয় বিরোধী দলকে পরাজিত করার মধ্যে নয়— নিজের ক্ষমতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারার মধ্যেই তার সবচেয়ে বড় সাফল্য নিহিত থাকে।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি