জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে সংস্কার সনদ (চার্টার) তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারে সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাবেন এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি।
সংস্কার সনদ ও গণভোটের প্রক্রিয়া
বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ৩১টি রাজনৈতিক সংগঠন একটি সংস্কার সনদে একমত হয়। তার দাবি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছাড়া বাকি সব দল ওই সনদে স্বাক্ষর করেছে।
তিনি বলেন, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। গণভোটে যে রায় আসবে, তা সবাই মেনে নেবে বলেও অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেই রায়ের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
শপথ গ্রহণে বৈষম্য
বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেন, বিরোধী দলের সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নিলেও সরকারি দলের সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সরকারের যুক্তি ছিল, বিষয়টি সংবিধানে নেই। তিনি বলেন, সংবিধানে অনেক বিষয়ই আগে ছিল না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনও সংবিধানে ছিল না। অতীতে অনুষ্ঠিত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গণভোটও সংবিধানে ছিল না। কিন্তু জাতীয় প্রয়োজনেই সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
গণভোটের ফলাফল উপেক্ষা
ডা. শফিকুর রহমানের দাবি, গণভোটে প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু সেই রায় উপেক্ষা করে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হলেও কার্যকর আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে নোটিশের মাধ্যমে আলোচনা হলেও কোনও সিদ্ধান্ত বা রুলিং আসেনি। তাই সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দল।
তিনি বলেন, আমরা জনগণকে দেওয়া ওয়াদা থেকে সরে যাব না। সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের পার্লামেন্টে যাব। জনগণের দাবি নিয়েই আমাদের আন্দোলন চলবে।
সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার
সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণ সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, সংস্কারের জন্য রায় দিয়েছে। সংস্কার ও সংশোধনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের বিষয় আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়ে, কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে হওয়া সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও হাইকোর্ট বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে আদালতের রায়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল হয়েছে।
জনগণের স্বার্থ সর্বোচ্চ
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই না কোনও রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন হোক। আমরা চাই জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়ন করা হোক। যেসব সংস্কার দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে, সেগুলোই বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় দেশ বারবার পথ হারাবে। তিনি বলেন, এ দাবিতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সময়ের সঙ্গে জনগণের অন্যান্য দাবিও কর্মসূচিতে যুক্ত হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আজাদ, শাহজাহান চৌধুরী, সাইফুল আলম খান মিলন, রফিকুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম বুলবুল, শফিকুল ইসলাম, সাইদউদ্দিন আহমদ হামজালা ও রাশেদুল ইসলাম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এস মাহমুদ জুবায়ের, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি সেলিম উদ্দিন এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। সভা পরিচালনা করেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।



