দেশের গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত জুন রাত আটটায় সারা দেশে ২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের মধ্যে শুধু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনেই ছিল ২ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময় মোট ঘাটতির ৯৬ শতাংশ ছিল গ্রামাঞ্চলে। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে না পেরে বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ কার্যালয় ও স্থাপনায় হামলা চালিয়েছেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। নিরাপত্তা শঙ্কায় থানায় সহায়তা চেয়েছে কয়েকটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
লোডশেডিং বাড়ায় হামলা ও বিক্ষোভ
প্রচণ্ড গরম ও বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সরবরাহের ঘাটতি থাকায় কোনো কোনো এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। আরইবির চিঠিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় লোকজন ও গ্রাহকেরা উপকেন্দ্রে এসে হামলা, দায়িত্বরত লাইন ক্রুদের মারধর, অফিস ঘেরাও, অফিস ভাঙচুর, অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা, বকেয়া বিল আদায়ে বাধা সৃষ্টি ও অফিসে এসে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি প্রদান করার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। ১০ জেলার ১৪টি স্থানে এমন ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে।
টাঙ্গাইলে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকেরা। দোহারে ভুতুড়ে বিল ও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুতের কার্যালয় ঘেরাও করে মানবন্ধন করেছেন তাঁরা।
সংসদ সদস্যদের চিঠি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন অন্তত চারজন সংসদ সদস্য। ২৮ জুন চিঠি পাঠিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তিনি জানান, নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর এলাকায় দিনে ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮ থেকে ৭০ মেগাওয়াট এবং রাতে ১৩১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭২ থেকে ৮৩ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। চিঠিতে ২০ মেগাওয়াট বিশেষ বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল ২৭ জুন চিঠি দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নাগরপুরে ১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১০ মেগাওয়াট, দেলদুয়ারে ২২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১৫ মেগাওয়াট।
রাজশাহী-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আবদুল বারী সরদার ২৮ জুন চিঠিতে জানান, বাগমারা উপজেলায় ২৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১২–১৪ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমর ১৮ জুন চিঠিতে জানান, তাঁর এলাকায় ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৫–৬ মেগাওয়াট।
মন্ত্রীর বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞের মতামত
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় গতকাল (রোববার) লোডশেডিং দিতে হয়েছে। আজ (সোমবার) উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট, চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ৩৩৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হবে। এটিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু জায়গায় লোডশেডিং থাকবে। যাতে না থাকে, সেই চেষ্টা আছে। গতকাল (রোববার) খারাপ ছিল, আজ (সোমবার) উত্তরণ করা গেছে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকায় কম দিয়ে, গ্রামে লোডশেডিং বেশি করা হচ্ছে। এ কারণে খেলা দেখতে না পেরে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। এখনই লোডশেডিংমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এটি শহর–গ্রামাঞ্চলে সহনীয় করতে হবে। বৃষ্টি হলে পরিত্রাণ মিলতে পারে। এ ছাড়া বকেয়া বিল শোধ করে কয়লা ও জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে।’



