তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল: পঞ্চদশ সংশোধনীর পথ ও পরিণতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল: পঞ্চদশ সংশোধনীর পথ ও পরিণতি

২০১১ সালের ৩০ জুন, বেলা ১০টা ৫০ মিনিটে জাতীয় সংসদের সভাকক্ষ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ ও মিত্র দলের সংসদ সদস্যদের ভোটে সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগের সেই পদক্ষেপ বদলে দেয় বাংলাদেশে নির্বাচনের গতিপথ এবং ফিরিয়ে আনে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের যুগ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উত্থান ও পতন

১৯৯৬ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১টায় সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয়। এর অধীনে ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই ব্যবস্থা বাতিল করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি সাধারণ নির্বাচনই বিতর্কিত ছিল। অথচ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না—এই দাবিতে আওয়ামী লীগ নিজেই তিন দশক আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করেছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পঞ্চদশ সংশোধনীর পথ

২০১০ সালের ২১ জুলাই সংসদের তৎকালীন উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিএনপি ও জামায়াত কমিটিতে অংশ নেয়নি, ফলে সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগ ও মিত্র দলের। কমিটি ২৬টি বৈঠক করে এবং ২০১১ সালের ৮ জুন ৫১ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রাথমিক খসড়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনে সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব ছিল। তবে ৩০ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর সবকিছু পাল্টে যায় এবং কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সুপারিশ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আদালতের ভূমিকা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৯ সালে একটি রিট আবেদন হয়। হাইকোর্ট ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ বলে রায় দেয়। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর আপিল মঞ্জুর করে শুনানি শুরু হয়। প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে।

সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ চাইলে আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। কিন্তু ১৬ মাস পর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই সুযোগ আর ছিল না, যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। রায়ের পক্ষে চার বিচারপতি এবং বিপক্ষে দুই বিচারপতি মত দেন; অপর একজন বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি

বিলটি পাসের সময় ২৯১ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং সবাই বাতিলের পক্ষে ভোট দেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত সংসদ বর্জন করেছিল।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার তাঁর 'তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রাজনীতি' বইয়ে লিখেছেন, "যেভাবে একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়, তাকে 'সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কতন্ত্র' বলা যায়।"

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর শেখ হাসিনা টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, যা একনায়কতান্ত্রিক সরকারের তকমা পায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ভারতে আশ্রয় নেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের পথ

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের আদেশ দেয়, তবে তা কার্যকর করতে হবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বর্তমান সংসদে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ সব প্রধান রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।