ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় ‘ডিবি পুলিশের হেফাজতে’ ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদের (২৭) মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফেসবুকে তাঁর আটকের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি ঘিরে ডিবির অভিযানের ধরন ও ইশতিয়াকের মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ভিডিওতে কী দেখা গেছে?
ভাইরাল হওয়া ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, ২১ জুন বিকেল পাঁচটার দিকে গোন্দারদিয়া এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ইশতিয়াক। তাঁর পরনে ছিল লুঙ্গি, কাঁধে ছিল একটি ল্যাপটপের ব্যাগ। এ সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি (যাঁদের স্থানীয় লোকজন ডিবি পুলিশের সদস্য বলে দাবি করছেন) ইশতিয়াককে ঘিরে ধরেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, লাল রঙের টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি প্রথমে ইশতিয়াকের গতি রোধ করেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। পরে সাদা টি-শার্ট পরা আরেক ব্যক্তি এসে ইশতিয়াককে ধরে তল্লাশি শুরু করেন। ভিডিওর ১৪ সেকেন্ডের মাথায় ইশতিয়াককে দুই হাত দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ভিডিওর ৩৬ সেকেন্ডে সাদা টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তিকে গালি দিয়ে ইশতিয়াককে থাপ্পড় দিতে দেখা যায়। এ সময় লাল টি-শার্ট পরা অপর ব্যক্তি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মারিস না।’
ভিডিওর ৪৩ সেকেন্ডের সময় অ্যাশ রঙের চেক শার্ট পরা আরেক ব্যক্তিকে মুঠোফোনে বলতে শোনা যায়, ‘লাঠি নিয়ে মরিচ বাজার এলাকায় আসেন, দ্রুত আসেন।’ পরে তাঁকেও ইশতিয়াকের দেহ তল্লাশির কাজে অংশ নিতে দেখা যায়।
ভিডিওর ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস ঘটনাস্থলে আসে। সেখান থেকে নারী সদস্যসহ আরও কয়েকজন এসে অভিযানে যুক্ত হন। ভিডিওর দুই মিনিট সাত সেকেন্ডের সময় অ্যাশ রঙের শার্ট পরা ব্যক্তিকে কিছু একটা দেখিয়ে ‘এই যে, এক টোপলা’ বলতে শোনা যায়। তবে ভিডিওতে দেখা যায়, ওই বস্তুটি ইশতিয়াককে তল্লাশির স্থান থেকে কিছুটা দূরে ছিল।
পরিবারের অভিযোগ
ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তার গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, আটকের পর ডিবির সদস্যরা তাঁর ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে যান। সেখানে নারী সদস্য দিয়ে তাঁকেও তল্লাশি করা হয়। পরে বাড়িঘর তল্লাশি করে ইশতিয়াককে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, রাতে ৬৫ হাজার টাকা দিলে ইশতিয়াককে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে তাঁদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে ডিবি পুলিশের কথা হয়েছিল। পরে ডিবি জানায়, এ ছেলে ছাত্রলীগ করে, আজ তাকে ছাড়া হবে না। পরদিন সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যেতে বলা হয়।
খাদিজা আক্তার বলেন, ‘সকালে আমি এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যাই। পরে শুনি আমার ছেলেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে আমার ছেলের লাশ পাই। জীবিত ছেলেকে আমাদের সামনে নিয়ে গেল, পরে তার লাশ পেলাম।’
পুলিশের বক্তব্য
তবে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে ইশতিয়াককে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর ২২ জুন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে ইশতিয়াককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ সুপার দাবি করেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা জেনেছেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং পুলিশ হেফাজতে তাঁকে কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি।
প্রতিক্রিয়া ও দাবি
ইশতিয়াকের মৃত্যুর সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাও ঘটনাটিকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



