জামায়াত নেতাদের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা: রাজনৈতিক কৌশল নাকি দায় স্বীকারের ইঙ্গিত?
দ্বিতীয়বারের মতো সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে দলটির আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন। তারা শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হিসেবে শ্রদ্ধা
স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হিসেবে তারা জাতীয় স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এই ঘটনা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে, বিশেষ করে যখন ২০০১ সালের পর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে জামায়াত নেতারা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন থেকে বিরত ছিলেন।
এর আগে ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন দলটির তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তবে সেই সময়ের পর থেকে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেননি, বরং বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা নানা ধরনের গোজামিল ও অস্পষ্ট বক্তব্যের আশ্রয় নিতেন।
অনুতাপহীন অবস্থান ও কৌশলগত পরিবর্তন
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা না চাইলেও স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে আলোচনা সভা এবং শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে জামায়াত। দলটি বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির দোহাই দিয়ে অথবা স্বাধীনতার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। তবে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া নিয়ে তারা কখনও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেনি।
মাঝে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর এবার তাদের স্মৃতিসৌধে যাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াত নেতাদের স্মৃতিসৌধে যাওয়া কি দায় স্বীকারের অংশ, নাকি এটি纯粹 রাজনৈতিক কৌশল?
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এই প্রসঙ্গে তার মূল্যায়ন প্রকাশ করে বলেন, "যেভাবেই হোক জামায়াত একাত্তর থেকে বের হয়ে আসতে চায়। এটি তারই একটি অংশ। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন থেকেই তারা মূলধারায় ফিরে আসার চেষ্টা করছে। ঘোষণা দিয়ে হয়তো ক্ষমা চাইবে না। তাদেরকে এভাবেই এগোতে হবে।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমি মনে করি, এক ধরনের কৌশল নিয়েই তারা সামনে আসতে চাইবে।"
অন্যদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেন, "বিরোধী দলীয় নেতা ও দলীয় প্রধান হিসেবেই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন আমিরে জামায়াত। তারা স্বাধীনতা দিবসকে লালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করেন। তাই আর তারা পেছনে ফিরে যেতে চান না। সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করছেন।"
একাত্তরের বিচার ও বর্তমান নেতৃত্ব
উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতা। এই মামলায় কারও কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, আবার কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারেই মারা গেছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন:
- সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী
- সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
- সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা
- মুহাম্মদ কামারুজ্জামান
- নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী
অপরদিকে, সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারেই মারা যান সাবেক আমির গোলাম আযম, সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী প্রমুখ। তবে একই মামলায় মৃত্যুদণ্ড হলেও সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রায় ১৭ বছর পর আদালত থেকে খালাস পেয়ে কারামুক্ত হন আরেক শীর্ষ নেতা এটি এম আজহারুল ইসলাম, যিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে রংপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
জাতীয় স্মৃতিসৌধে জামায়াত নেতাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়টিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, "প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার ও শহীদদের সম্মান জানিয়ে রাজনীতি করতে হবে। তাই জামায়াত হয়তো সেই উপলব্ধি থেকে স্মৃতিসৌধে গিয়েছে। তাদের নেতারা বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যে একাত্তর নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তারপরও আমি মনে করি, আনুষ্ঠানিকভাবেও তাদের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।"
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মন্তব্য করেন, "জামায়াত দল হিসেবে স্মৃতিসৌধে গিয়েছে বলে দলটির নেতারা নিজেরাও বলেননি। তারা রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ ও বিরোধী দল হিসেবে সেখানে গিয়েছেন। যা তারা নিজেরাও উল্লেখ করেছেন। এতে প্রমাণ হয়— তারা এখনও মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে না এবং শহীদদের শহীদ হিসেবে মানে না।"
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, "জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধে সম্মান জানালেও অতীতের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। সামনে তারা কী করতে চায়, সেটা তাদের ব্যাপার।"
উপসংহার
জামায়াতে ইসলামীর স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হবে কিনা, তা এখনও সময়ই বলবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, দলটি তাদের অতীতের অবস্থান থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা বা দায় স্বীকারের বিষয়ে তারা এখনও সম্পূর্ণ নীরব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জামায়াতের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে তারা মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে।



