খুলনায় এনসিপির ইফতার অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
খুলনা নগরের জেলা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে সোমবার বিকেলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত বিভাগীয় ইফতার অনুষ্ঠানে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গটি সামনে আনেন।
সরকারের বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন
নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, "আজ যে নির্বাচিত সরকার এসেছে, সেই সরকার হাওয়া থেকে আসে নাই।" তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন যে এই সরকার কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসেনি, বরং এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক আয়োজিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। তাঁর মতে, এই সরকারের বৈধতা সম্পূর্ণভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং সেই সময়ে জারি হওয়া সনদ আদেশের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতাও ছিল গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফল বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
সংবিধান সংস্কারের প্রতি জোরালো আহ্বান
ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "নির্বাচিত সরকার যাতে এটা ভুলে না যায়, আমরা কেউই যাতে এটা ভুলে না যাই।" তিনি উল্লেখ করেন যে জাতীয় সংসদ যদি পুরোনো সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার সভা থেকে বিরত থাকে অথবা শপথ গ্রহণ থেকে পিছিয়ে যায়, তাহলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, এই নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা—সবকিছু নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। তাঁর ভাষায়, "গণ-অভ্যুত্থানের শাহাদাতের সঙ্গে, হাজারো মানুষের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা হবে।"
বিভিন্ন দলের একত্রিত উপস্থিতি
একই মঞ্চে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিকে ইঙ্গিত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারণেই আজ আমরা একই মঞ্চে উপস্থিত হতে পেরেছি।" তিনি উল্লেখ করেন যে শত শত শহীদের রক্তের ওপর ভিত্তি করেই তারা সেখানে বসতে পেরেছেন। জাতীয় সংসদে একসঙ্গে বসে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সব আদেশ কার্যকর করতে আগ্রহী।
অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, "পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে বিভিন্ন আওয়ামী লীগ কালচারাল শক্তি ও মিডিয়া পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।" তিনি দাবি করেন যে তরুণ প্রজন্ম সচেতন থাকলে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের উদ্দেশে বলেন, "জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা জুলাই সনদকে ভুলে গিয়ে ভিন্নমত পোষণ করবেন না।" তিনি উল্লেখ করেন যে ৬৯ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদকে সমর্থন দিয়েছে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন যদি সেটা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে তা শপথের সাথে অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।
খুলনার পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী খুলনায় ভারতের কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের জন্য এবং খুলনার প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য চরমভাবে হুমকিস্বরূপ।" তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান যাতে ভারতের সাথে এই চুক্তি বন্ধ করে ধ্বংসকারী প্ল্যান্ট বন্ধ করা হয়।
তরুণ-যুবকদের উদ্দেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, "আপনারা ভয় পাবেন না। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কমিটি গঠন করুন।" তিনি পরামর্শ দেন যে যারা চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের রাস্তায় বা গাছের সাথে বেঁধে রাখার পর প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য উপস্থিতি
এই ইফতার অনুষ্ঠানে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল হক, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় নারীশক্তির মুখ্য সংগঠক নুসরাত তাবাসসুম, ডক্টরস অ্যালায়েন্সের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান, খুলনা-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক ওয়াহিদ উজ জামান।
এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খুলনা অঞ্চলে রাজনৈতিক ঐক্য ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



