প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান রোববার বলেছেন, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হলে অপরাধ দমন সহজ হবে। পুলিশ সদস্যদের জনগণের আস্থা অর্জন এবং নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসন কোনো দলের নয়; পুলিশ প্রশাসন আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা অবশ্যই আপনার দায়িত্ব।’
পুলিশের সাফল্য সরকারের সাফল্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশ যদি জনগণের জন্য আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক হতে পারে, তাহলে সেটাই পুলিশের সাফল্য। পুলিশের সাফল্য মানে সরকারের সাফল্যও বটে। তিনি পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘ওয়েলফেয়ার প্যারেড’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য
পুলিশের দায়িত্ব ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক যেন বিশ্বাস ও পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। যেকোনো বিপদ বা সংকটে যেন জনগণ থানাকে তাদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল মনে করে।’
প্রধানমন্ত্রী জনগণকে রাষ্ট্রের মালিক উল্লেখ করে বলেন, ‘জনগণ যদি মালিক হয়, তাহলে বিপদের সময় তারা থানায় গেলে আপনার আচরণে যেন তারা রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারে—সেটি নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্বের অংশ।’
মানবতার স্পর্শ প্রয়োজন
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লেই থানায় যায়, তাই তাদের মনে এই ধারণা তৈরি করা জরুরি যে থানায় গেলে তাদের কষ্ট লাঘব হবে। ‘আপনি যেকোনো বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবেনই। কিন্তু যদি মানবতার স্পর্শ থাকে, তাহলে আপনার কারণে সরকারের সাফল্য জনগণের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
পুলিশ সদস্যরা সরকারের দূত
প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের মাঠপর্যায়ে সরকারের দূত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তারা দক্ষতা ও তাৎক্ষণিক কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য নন; রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ন্যায়বিচার প্রদানের প্রথম দ্বার।
সরকারের অগ্রাধিকার
বর্তমান সরকার দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পুলিশ বাহিনীকে তার সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। এখন অন্ধকার সময় পেরিয়ে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সময়। আমি বিশ্বাস করি, জনগণের আস্থা অর্জন এবং তা ধরে রাখা বর্তমানে পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
প্রযুক্তি ও আধুনিকায়ন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন দক্ষ, আধুনিক ও মানবিক পুলিশ বাহিনী ছাড়া জনগণের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এই কঠিন কাজ শুরু করেছে। ‘তাই সরকার আপনার দাবিগুলো সাধ্যমতো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।’
পুলিশি কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা
তিনি বলেন, ‘আমরা থানায় এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে একজন মানুষ সরাসরি কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই যেতে পারে, ভয় ছাড়াই অভিযোগ দায়ের করতে পারে এবং একইসঙ্গে প্রতিকার পেতে পারে।’ জনগণের সহযোগিতা ছাড়া দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন উল্লেখ করে তিনি পুলিশকে কমিউনিটি পুলিশিং ও ওপেন হাউস ডে-র মতো জনমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে পুলিশি কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান।
মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান
সরকারের মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, সংগঠিত অপরাধ, কিশোর গ্যাং, আর্থিক জালিয়াতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। ‘প্রতিদিন সাধারণ মানুষ এসব অপরাধের শিকার হচ্ছে। দেশে মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়া নিয়েও জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাই কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক সরবরাহকারী ও মাদকের উৎস লক্ষ্য করে মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে অভিযান পরিচালনা করা পুলিশের জন্য জরুরি।’
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাইবার পুলিশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডাটা বিশ্লেষণসহ উদীয়মান প্রযুক্তির সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে সরকার আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক পুলিশিং ব্যবস্থা গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মানবাধিকার ও আইনের শাসন
সরকার দেশে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারিক রহমান বলেন, ‘জোরপূর্বক গুম, অপহরণ বা বিচারবহির্ভূত কার্যকলাপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকার বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদা, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থা আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা পুলিশে বদলি, পদোন্নতি বা নিয়োগে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দিতে চাই।’
পুলিশ বাহিনীকে দক্ষ ও আধুনিক করার তাগিদ
প্রধানমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনীকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করার বিকল্প নেই।’ এ লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যদের আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আবাসন সংকট সমাধান, মানসম্মত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিতকরণ, রেশন ও ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সুবিধাও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
সরকার জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কখনো পিছিয়ে আসবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও কুশাসনে বিপর্যস্ত দুর্বল শাসন কাঠামো, ক্রমবর্ধমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার সরকারকে বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ‘এমন বাস্তবতায় কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে আপনার সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে আমরা কখনো পিছিয়ে আসব না।’
মানবতা, ন্যায়বিচার ও জাতীয় ঐক্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্ত্রের শক্তির চেয়ে মানবতা, ন্যায়বিচার ও জাতীয় ঐক্য বড় শক্তি। ‘আমাদের পথ সহজ নয়, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য মহৎ। আমরা একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত এবং ভার্চুয়ালি সংযুক্ত সব কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



