ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শাপলা কলি প্রতীকে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয় পায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দলটি অনেকের মনে আশা জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে দলটির ভেতরেই দেখা দেয় সংকট। কয়েকজন নেতা দলও ছাড়েন। নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে জোট আর কত দিন থাকবে, সে প্রশ্নও উঠেছিল এনসিপির সভায়। তবে এখন পর্যন্ত যতটা জানা যাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে থেকেই চলতে চায় এনসিপি। এ ক্ষেত্রে দলটির নেতাদের যুক্তি, আলাদাভাবে চলার মতো সক্ষমতা এক বছরে অর্জন করা যায়নি। তাতে আবার প্রশ্ন আসছে, এভাবে রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান কি এনসিপি তৈরি করতে পারবে?
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন
এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছেন তাঁরা। তবে এখন যে সাংগঠনিক সক্ষমতা, তাতে একার পক্ষে তা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে থেকেই আন্দোলন জোরদার করে ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর চাপ বাড়াতে চান তাঁরা।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলে বিএনপিকে চাপে ফেলতে চাইছে এনসিপি। আর তা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে থেকেই করতে চায়।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের বক্তব্য
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দলীয় কর্মসূচি ও ১১–দলীয় ঐক্যে থেকে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলাই এখন এনসিপির অগ্রাধিকার। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরুত্থান যাতে না হতে পারে, সে জন্য জুলাই সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হতেই হবে।’
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে তা বাস্তবায়নের পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে ১১–দলীয় ঐক্যের অভিযোগ। সে জন্য বিএনপিকে চাপ দিয়ে যেতে চায় তারা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা
এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের আসন্ন নির্বাচনগুলোও জোটবদ্ধভাবেই করতে চায় এনসিপি। দলটির নীতিনির্ধারকদের মূল্যায়ন হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের কার্যকর সুযোগ রয়েছে। সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে পারলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
দুজন সংসদ সদস্যসহ এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলে দলটির এই চিন্তার কথা জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, এনসিপির রাজনীতির প্রধান প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের বিলোপের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার। দলের সাংগঠনিক বিস্তার না হলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এনসিপির সাংগঠনিক সক্ষমতা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই এনসিপিকে জোটের রাজনীতি করতে হচ্ছে।
জোটের ভেতরে বিতর্ক ও সমালোচনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সময় এনসিপির একটি অংশ আপত্তি তুলেছিল। তবে বড় অংশের সমর্থন ছিল জোটের পক্ষে। এরপর দলটির অন্তত ১৭ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেন। আর কয়েকজন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। দলে প্রতিক্রিয়া হলেও এনসিপির নীতিনির্ধারকেরা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ঐক্য থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে অটল ছিলেন। ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির ৩০ জন নির্বাচনে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ ছয়জন বিজয়ী হয়ে এখন সংসদে রয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা নিয়ে এনসিপির বর্তমান কমিটির একটি অংশেরও আপত্তি আছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে দলে সেই অংশের প্রভাব কম। দলের বাইরেও অনেকে প্রায়ই এনসিপির এই জোটে থাকার সমালোচনা করে থাকেন। জামায়াতের সঙ্গে জোটে থেকে এনসিপি আলাদা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। এনসিপির নেতাদের একটি অংশ একসময় জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল—প্রায়ই এ বিষয় সামনে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির সমালোচনা করেন কেউ কেউ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কের সমালোচনা
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ৯ দফার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তখনকার সমন্বয়ক আবদুল কাদের এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের জোটের কড়া সমালোচকদের একজন। গত ২২ এপ্রিল তিনি এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ওপরে–ওপরে পার্টি, ভেতরে–ভেতরে ‘প্রক্সি উইং’—এনসিপির অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে দল হিসেবে এনসিপির ভবিষ্যৎ কী?
তবে এ ক্ষেত্রে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতার ভাষ্য, এনসিপি আর জামায়াতের মতাদর্শ ভিন্ন। যেহেতু এখনো সেভাবে সাংগঠনিক সক্ষমতা তৈরি হয়নি, তাই জোটের রাজনীতি করতেই হচ্ছে। আর বর্তমানে রাজনীতিতে বিএনপির বিপরীতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটই সক্রিয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুতে এনসিপির অবস্থান
জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলেও এনসিপির মৌলিক নীতি যে ভিন্ন, সে বিষয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনসিপির নেতারা গত ৯ এপ্রিল সংসদে একটি বিষয়ে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে গত ৯ এপ্রিল সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়। সেই বিলের বিষয়ে জামায়াত আপত্তি জানালেও এনসিপি জানায়, এই বিলের বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে জোট করাকে কেন্দ্র করে যেসব নেতা–কর্মী এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, তাঁদেরও দলে ফেরানোর চেষ্টা আছে এনসিপির। এ বিষয়ে এনসিপির নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যতম সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, পদত্যাগীদের দলে ফেরাতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথাবার্তা হচ্ছে। তবে দলত্যাগী কেউ ফিরছেন—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।



