দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে পাহাড়ে উত্তাপ

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগ পাহাড়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও উত্তাপ ছড়িয়েছে। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথে। ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে রাঙামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল, যদিও তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন দীপেন বিরোধীরা।

পদত্যাগের ঘটনা

সোমবার (১ জুন) শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর সরাসরি পদত্যাগপত্র জমা দেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এর পরপরই গত দুই দিন ধরে বিষয়টি রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তোলপাড় করেছে পাহাড়ের রাজনৈতিক অঙ্গন। তার পদত্যাগের নেপথ্যে বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসছে ব্যাপক আলোচনা, নানা গুঞ্জন, বিতর্ক, কৌতূহল ও প্রশ্ন। জনমনে দেখা দিয়েছে মিশ্র ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।

প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ

দীপেনের মন্ত্রিত্ব ছাড়ার বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারছেন না তার অনুসারী ও দলের স্থানীয় বড় অংশের নেতাকর্মীরা। তারা দীপেনের মন্ত্রিত্ব পুনর্বহালের দাবিতে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছেন। উঠেছে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের ঝড়। আন্দোলন গড়িয়েছে রাজপথে। কেউ বলছেন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নিজ দলীয় বিরোধীদের ষড়যন্ত্র ও তার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন দীপেন। আবার কেউ বলছেন, বিষয়টি শারীরিক জটিলতা নয়- মন্ত্রণালয় পরিচালনার কর্তৃত্ব, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ও রাঙামাটি জেলা বিএনপি রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে দলের কিছু মহলের ষড়যন্ত্রে তার কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারি পদক্ষেপ

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। এ পদত্যাগপত্র অবিলম্বে কার্যকর হবে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী, উপজাতীয়দের মধ্য থেকে নতুন কোনো মন্ত্রী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই থাকবে বলে জানা যায়।

দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক পটভূমি

বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ধর্মবিষয়ক সহ-সম্পাদক দীপেন দেওয়ান ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯-পার্বত্য রাঙামাটি আসন থেকে সারা দেশে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পূর্ণমন্ত্রী হন তিনি। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ১৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক কাজে যোগ দেন।

অনুসারীদের বিক্ষোভ

বর্তমান বিএনপি সরকারের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর পদ ছাড়ায় ক্ষোভ ও হতাশায় তার অনুসারী ও দলের স্থানীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন মহল। তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটিতে বিক্ষোভ করছেন অনুসারীরা। দাবিটি জানিয়ে সোমবার (১ জুন) রাঙামাটি শহরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করা হয়েছে। একই দিন জেলার বাঘাইছড়ি ও কাউখালী উপজেলাতেও বিক্ষোভ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল থেকে দিনব্যাপী বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ এবং কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এদিন বিকালে রাঙামাটি শহরের কলেজগেট এলাকাতেও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের দাবি, দীপেন দেওয়ানকে চাপের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ, যদিও পদত্যাগপত্রে শারীরিক জটিলতা ও অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

নিজের ফেসবুক পোস্টে বিএনপির কেন্দ্রীয় জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির উপজাতিবিষয়ক সহ-সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) মনীষ দেওয়ান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির স্বার্থে সত্য প্রকাশ করা জরুরি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তাকে মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করেছিলেন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। আর এ কারণেই তিনি মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন বলে দাবি করেন মনীষ দেওয়ান। ফেসবুক পোস্টে তিনি নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাঙামাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন তালুকদার দিপুকে চেয়ারম্যান পদে দেখতে চেয়েছিলেন। মনীষ দেওয়ান তার পোস্টে আরও অভিযোগ করেন, সুপারিশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বে পূর্ণমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পরাজিত হয়েছেন। তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কাপ্তাইয়ের মো. ডালিম লেখেন, প্রশ্ন হচ্ছে রাঙামাটি বিএনপির রাজনীতিতে মীর হেলাল কে? মীর হেলালকে তো রাঙামাটির মানুষ ভোট দিয়ে এমপি, মন্ত্রী বানায়নি? ভোট দিয়েছে দীপেন দেওয়ানকে, এমপি বানিয়েছে, মন্ত্রী বানিয়েছে। তাহলে রাঙামাটির বিষয়ে কথা বলার মীর হেলাল কে? এতে মন্তব্য করে মো. ফোরকান লেখেন, প্রতিবাদ হোক, রাঙামাটি জেলার ১১টা উপজেলার প্রত্যেক ওয়ার্ড, ইউনিয়নে একযোগে প্রতিবাদ সভা হোক মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হক। আরেক পোস্টে কাপ্তাইয়ের দিলদার লিখেছেন, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্রে যারা খুশি হয়েছেন। মনে রাখবেন আপনাদের সংখ্যা নগণ্য অতি... এই অঞ্চলের জনগণ দীপেন দেওয়ানকেই ভালোবাসে এবং অনেক বেশি।

অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল

স্থানীয়রা জানান, রাঙামাটি জেলা বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তি ছিল, যা এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও প্রকাশ্য ছিল। যদিও নির্বাচনের সময় তা চাপা রাখেন দীপেন বিরোধীরা। বর্তমানে তা আবার প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের নেতৃত্বাধীন অনুসারীরা দীপেন দেওয়ানের বিরুদ্ধে ছিলেন সক্রিয়। একটা সময় তারা দীপেন দেওয়ানকে দলীয় কার্যালয়েও ঢুকতে দেননি। দীপেন দেওয়ান সংসদ-সদস্য নির্বাচিত ও পার্বত্যমন্ত্রী হওয়ার পর তার পক্ষে থেকে তাকে তাদের মতো করে চালানোর চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু এতে দীপেন দেওয়ান সমর্থন ও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়াই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় বলে দাবি করেন দীপেন অনুসারীরা।

তবে দলীয় কোন্দল বা বিরোধের বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করে দীপন তালুকদার বলেন, আমাদের দলে কোনো রকম কোন্দল নেই। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়টি তার একান্ত ব্যক্তিগত। যে বিষয়টি তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন, সেটুকুই জানি। এর বাইরে কী কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন, তা আমার জানা নেই।

দীপেন অনুসারী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টো বলেন, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ বিএনপির ও পাহাড়ের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটা পাহাড়ি-বাঙালি সবার জন্য ক্ষতিকর। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত ও ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব ফেরত দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে অসুস্থ নন। তাকে কখনো শারীরিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ অবস্থায় দেখা যায়নি। বিএনপির কিছু নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।