জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার পথ এখনো স্পষ্ট নয়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোনো অবস্থানেই অনড় রয়েছেন। ‘রিফাইন্ড’ বা ‘পরিশুদ্ধ’ আওয়ামী লীগের ধারণা দলের ভেতরে আলোচিত হলেও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
নেতৃত্বে পরিবর্তনের অসম্ভাবনা
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের পদ ছাড়তে নারাজ। বড়জোর সাধারণ সম্পাদকের বিকল্প হিসেবে মুখপাত্র নিয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু তা শুভাকাঙ্ক্ষীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে সংস্কারের সব উদ্যোগ আপাতত ‘মৃত’ বলে মত দলের নেতাদের। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা কিংবা পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থান বদলের কোনো লক্ষণ নেই।
‘রিফাইন্ড’ ধারণা ও বাস্তবতা
‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ ধারণাটি প্রথম সামনে আসে গত বছর মার্চে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে একটি পোস্টে দাবি করেন, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভারতের; সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে এটি সাজানো হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার অনুমোদন ছাড়া নতুন কোনো সাংগঠনিক কাঠামো টেকসই হবে না বলে মনে করেন দলের নেতারা।
দলের ভেতরে হতাশা ও বিভাজন
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকের কাছেই দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ স্পষ্ট নয়। অনেকের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান সরকার যদি বড় ধরনের ভুল করে বা অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ঝুঁকি বিএনপির পক্ষে এখন নেওয়া কঠিন।
দলের কট্টরপন্থী নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনার বিকল্প আওয়ামী লীগে নেই। আর যদি বিকল্প আনতে হয়, তবে তাঁর পরিবার থেকেই হতে হবে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রস্তুত কেউ নেই। কট্টরপন্থীদের মত হচ্ছে—আগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম শুরুর অনুমতি পাক, তারপর সংস্কার আনা হবে, তবে শেখ হাসিনাকে রেখে এবং অন্য বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে।
বিদেশে নেতাদের অবস্থান ও কার্যক্রম
শেখ হাসিনা নিজেই দলের নীতি নির্ধারণ করছেন। দেশের ভেতর ও আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। সরকারের ভেতরের বিভিন্ন সংস্থায় থাকা দলঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, যিনি কলকাতায় অবস্থান করছেন। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ও চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মতো ‘সফট’ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ কিছু নেতা।
দেশে ব্যবসা আছে এমন সাবেক সংসদ সদস্য, বিদেশে পরিবার থাকে এমন নেতা কিংবা বয়সে জ্যেষ্ঠ অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হওয়ার কথাও বলছেন। দেশে ফিরলে জামিন মিলবে—এমন আশ্বাস পেলে ফেরার কথা ভাবছেন ব্যবসায় যুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য বা নেতারা। তবে এখন পর্যন্ত কেউ এই নির্দেশনায় সাড়া দেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, “আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে ফিরে আসার চিন্তা করে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, দেশের জন্য ভয়াবহ হবে, সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসবে।” তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসন ও রাজনীতি নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি ও ভুল স্বীকার করতে হবে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতি একধরনের ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ রূপ নিয়েছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। দলটির নেতাদের মধ্যে রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা আছে, তবে তা কীভাবে সম্ভব, এর কোনো স্পষ্ট পথ জানা নেই।



