স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু তৎপরতা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকার সতর্কতামূলক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার (২২ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ছয় জেলায় সেনা মোতায়েনের কারণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ যে মাফিয়া বাহিনী আওয়ামী লীগ, তাদের কিছু অপতৎপরতা বিভিন্ন জেলায় দেখা যাচ্ছে। তারা মিছিল-মিটিং ধরনের কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এমন দুই-একটি ঘটনা আমরা দেখেছি। এতে আমাদের মনে হয়েছে, তারা হয়তো অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে পারে। সেই বিবেচনায় আমরা সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সোমবার (২২ জুন) থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আইন অনুযায়ী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে সেনা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। এর আওতায় থাকবে— ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা এবং ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলা।
পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতা নয়
তিনি বলেন, যে কোনও রকম অপতৎপরতা যেন সঙ্গে সঙ্গে অ্যাড্রেস করা যায়, সে জন্যই এই মোতায়েন। সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতার ইঙ্গিত কিনা— এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি পুলিশের ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং রুটিন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, আস্থা-অনাস্থার প্রশ্ন আসে কেন? আমাদের পুলিশ বাহিনী অনেক কৃতিত্বপূর্ণ কাজ করেছে, তাদের অর্জন আছে। আমরা সেগুলো পুরস্কৃতও করেছি। কোথাও কোথাও কেউ শৃঙ্খলাবহির্ভূত কাজ করলে তাদের শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। এখানে আস্থাহীনতার কোনও বিষয় নেই।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেই আমরা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় কখনও বিজিবি, কখনও সেনা সদস্যদের নিয়োগ করি। এটা রুটিন ওয়ার্ক।
আগের সেনা প্রত্যাহার ও বর্তমান মোতায়েন ভিন্ন
সেনাবাহিনী ১৫ জুন সারা দেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এ অবস্থায় আবার নতুন করে ছয় এলাকায় মোতায়েনের কারণ কী প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের পরিস্থিতি আর বর্তমান সিদ্ধান্ত এক নয়।
তিনি বলেন, ১৫ জুন সারা বাংলাদেশ থেকে সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা প্রায় দেড় বছর মাঠে ছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার আসার পর আমরা যত দ্রুত সম্ভব তাদের মাঠ থেকে প্রত্যাহার করেছি। এখন যে কয়েকটি জায়গায় মোতায়েন করা হচ্ছে, তার সঙ্গে আগের পরিস্থিতির কোনও মিল নেই। এটা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার– পুলিশকে সহযোগিতার জন্য।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ছয় এলাকা নির্বাচন
কেন শুধু ছয় এলাকায়? এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব জায়গায় একই ধরনের ঝুঁকি নেই। কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা তুলনামূলক বেশি বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করেছি, কিছু কিছু জায়গায় তাদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের ভিত্তিতে এটা বলা হচ্ছে। শুধু এটুকুই নয়, আরও কিছু বিষয় আছে– আমি এখানে সব খুলে বলতে চাই না। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কিছু কিছু মহল অপতৎপরতায় লিপ্ত আছে। সেই কারণেই আমরা এলার্ট থাকার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নাশকতার আশঙ্কা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
নাশকতার আশঙ্কা আছে কিনা প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে– এমন আশঙ্কা থেকেই সরকার বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। কিন্তু আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। তারা যদি অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, সেটা যেন সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা।
এমপির ছেলের জিজ্ঞাসাবাদ ও মুচলেকা
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এক সংসদ সদস্যের ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পরে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের চোখে কেউ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নন।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির ছেলের কি কোনও বিশেষ অধিকার আছে? আইনের চোখে সবাই সমান। পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অভিযোগ ছিল। সেগুলোর বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ প্রয়োজন মনে করেছে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিতে, তাই করা হয়েছে।
পূজা উদযাপন পরিষদের সঙ্গে বৈঠক
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবি এবং সাম্প্রতিক একটি ভাইরাল ছবি নিয়ে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা অনেক দিন আগে থেকেই সময় চেয়েছিলেন। সোমবার তাদের সঙ্গে বৈঠকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবি এবং একটি ভাইরাল ছবিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়েও কথা হয়েছে।
এক নারী নেত্রীর আলাদা পরিচয় বা অবস্থান নিয়ে বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হয়তো এটা তার স্লিপ অব টাং হতে পারে। বক্তৃতা দিতে গিয়ে অনেক সময় অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।
অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
১১ দলের নেতাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিগত অনেক সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
তিনি বলেন, সত্যিকার ডাটা, তথ্য, রিপোর্ট সবকিছু বিশ্লেষণ করে দেখুন। বিগত যেকোনও সময়ের তুলনায় অন্যান্য বছর এবং মাসওয়ারি অপরাধচিত্র আমাদের এ সময়ে ভালো।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলো সমাবেশ করবে– এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। বিরোধী দল ১১ দলের ব্যানারে সমাবেশ করছে, গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে। তারা তাদের কথা বলবে, আমরাও আমাদের কথা বলবো।



