বাংলাদেশ পুলিশের জন্য জনসংখ্যাভিত্তিক পুলিশ ইউনিট গঠন এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী কর্মবিভাজন এখন সময়ের দাবি। দেশের অধিকাংশ থানা এখনও প্রায় একই সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, অথচ তাদের জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি, অপরাধের ধরন এবং কাজের চাপ একেবারেই ভিন্ন। এই বৈষম্য দূর করতেই বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (সিআইডি) ড. মো. রুহুল আমিন সরকার।
থানার কাঠামোয় বৈষম্য ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে এমন বহু থানা রয়েছে, যেখানে দৈনিক কাজের চাপ একটি ছোট জেলার সমান, আবার কোথাও একটি থানার জনসংখ্যা একটি জেলার জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মতো থানাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব, দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার বিস্তার এবং প্রতিদিনের জনসমাগমের কারণে পুলিশকে বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্থানীয় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় কেরানীগঞ্জ থানার জনসংখ্যা দেশের কয়েকটি ছোট জেলার সমপর্যায়ের, এমনকি তিন পার্বত্য জেলার সম্মিলিত জনসংখ্যার সঙ্গেও তুলনা করা হয়। অথচ এসব থানার জনবল বণ্টন ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এই বৈষম্যের প্রতিফলন নেই।
পরিবর্তিত অপরাধের ধরন ও বিশেষায়নের প্রয়োজনীয়তা
আজকের বাংলাদেশে অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় থানার প্রধান কাজ ছিল চুরি, ডাকাতি, মারামারি বা হত্যা মামলার তদন্ত; এখন যুক্ত হয়েছে সাইবার প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, মাদক চক্র, কিশোর গ্যাং, নারী ও শিশু নির্যাতন, সড়ক নিরাপত্তা, শিল্পাঞ্চলের শ্রম অসন্তোষ, ভিআইপি নিরাপত্তা এবং জরুরি সেবায় তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার মতো অসংখ্য দায়িত্ব। একজন পুলিশ সদস্যের পক্ষে একই সঙ্গে এসব বিষয়ে সমান দক্ষতা অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশেষায়ন একটি স্বীকৃত নীতি; যেমন চিকিৎসা বিজ্ঞানে একজন চিকিৎসক একই সঙ্গে হৃদরোগ, ক্যানসার ও শিশু চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ হন না। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে থানার ভেতরেই তদন্ত, সাইবার অপরাধ, জনশৃঙ্খলা, গোয়েন্দা তথ্য, ভিকটিম সাপোর্ট এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার জন্য পৃথক বিশেষায়িত দল গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিশেষায়িত ইউনিটসমূহ
ড. রুহুল আমিন সরকার প্রতিটি থানায় ছয়টি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন:
- পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ইউনিট: রাজনৈতিক কর্মসূচি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, নির্বাচন, শ্রমিক আন্দোলন, বড় জনসমাবেশ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করবে। সাধারণ থানায় ৮০-১৫০ জন এবং বড় থানায় (কেরানীগঞ্জ, সাভার, ফতুল্লা, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, আশুলিয়া) ৩০০-৪০০ জন সদস্য থাকা উচিত।
- মামলা তদন্ত ও ফরেনসিক ইউনিট: থানার আকার অনুযায়ী ২০-৬০ জন তদন্ত কর্মকর্তা থাকবেন, যারা শুধু তদন্ত করবেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে মানসম্পন্ন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
- সাইবার ক্রাইম ও ডিজিটাল ফরেনসিক ইউনিট: প্রতিটি থানায় কমপক্ষে ৩-৫ জন এবং বড় থানায় ১০-১৫ জন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকবেন, যারা সিআইডি ও পিবিআইয়ের প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ করবেন।
- জরুরি সাড়া ও ৯৯৯ রেসপন্স ইউনিট: ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত ১৫-৩০ জন সদস্য পালাক্রমে জরুরি কল, দুর্ঘটনা, ডাকাতি, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতায় তাৎক্ষণিক সাড়া দেবেন।
- কমিউনিটি পুলিশিং ও ভিকটিম সাপোর্ট ইউনিট: ১০-২০ জন সদস্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও নারী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করবেন এবং নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের আইনি ও মানবিক সহায়তা দেবেন।
- গোয়েন্দা ও অপরাধ বিশ্লেষণ ইউনিট: ১০-১৫ জন সদস্য অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করবেন, কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তথ্য বিশ্লেষণ করবেন।
মিনি মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটের ধারণা
যেসব থানার জনসংখ্যা ১০ লাখের বেশি, বছরে হাজার হাজার মামলা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল রয়েছে, সেগুলোকে ‘মিনি মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন ড. রুহুল আমিন। এসব ইউনিটের নেতৃত্বে থাকবেন একজন পুলিশ সুপার (এসপি)। আর যেসব থানার জনসংখ্যা ১৫-২০ লাখ বা তার বেশি, সেখানে অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। এই ইউনিটের অধীনে থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, পর্যাপ্ত পরিদর্শক, তদন্ত কর্মকর্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ড্রোন, সিসিটিভি মনিটরিং সেন্টার ও আধুনিক কন্ট্রোল রুম।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
যুক্তরাজ্যে প্রতিটি পুলিশ বাহিনী এলাকার জনসংখ্যা, অপরাধের ধরন ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে জনবল নির্ধারণ করে এবং থানার ভেতরে তদন্ত, সাইবার অপরাধ, কমিউনিটি পুলিশিং ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য পৃথক ইউনিট রয়েছে। জাপানের ছোট পুলিশ বক্স (কোবান) জনগণের কাছাকাছি অবস্থান করে এবং বড় শহরে বিশেষায়িত ইউনিট কাজ করে। সিঙ্গাপুরে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, সিসিটিভি মনিটরিং ও তথ্য বিশ্লেষণের সমন্বিত ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা কার্যকর রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি শহরের পুলিশ বিভাগের কাঠামো জনসংখ্যা ও অপরাধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়; বড় শহরে হোমিসাইড ইউনিট, সাইবার ইউনিট, নারকোটিকস ইউনিট, সোয়াট টিম, ট্রাফিক ইউনিট, গ্যাং ইউনিট ও ভিকটিম অ্যাসিস্ট্যান্স ইউনিট রয়েছে।
সংস্কারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
আইনশৃঙ্খলা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত। দ্রুত মামলা তদন্ত, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের দ্রুত সাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। ড. রুহুল আমিন সরকারের মতে, প্রকৃত সংস্কার হবে তখনই, যখন জনসংখ্যা, অপরাধের ধরন, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতাকে ভিত্তি করে প্রতিটি থানার জন্য পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।



