স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে বগুড়ার দুটি ইউনিয়নের নামকরণের পর তা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই নির্দেশনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে কেউ কেউ প্রশাসনিক জবাবদিহি ও মন্ত্রীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে অনেকে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। এন আই আবির নামের এক ব্যবহারকারী গতকাল শুক্রবার লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরিবর্তন হচ্ছে সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়নের নাম। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে।’ এ–সংক্রান্ত একটি সংবাদ শেয়ার করে বারকাজ নাসির আহমেদ নামের আরেকজন আজ শনিবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আশা করি বাকি দুটি নামও পরিবর্তন হবে।’
তবে শুধু প্রশংসাই নয়, বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবিদ হাসান নামের এক ব্যবহারকারী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার মানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। প্রধানমন্ত্রী সব কাজ করলে মন্ত্রীদের কাজ কী? মন্ত্রীদের আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।’
বিতর্কিত ইউনিয়ন গঠনের পটভূমি
১১ জুন বগুড়ার জেলা প্রশাসকের সই করা প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা জানানো হয়। এতে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয় ‘মীরবাড়ী’। অন্যদিকে মোকামতলা উপজেলায় গঠন করা তিনটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’।
চারটি নতুন ইউনিয়নের মধ্যে মীরবাড়ী, সীমান্ত ও দিগন্ত—এই তিনটির নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নামে একটি ইউনিয়ন এবং তাঁর দুই ছেলের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ী’, বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত।
সংসদে ব্যাখ্যা ও সমালোচনা
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয় এবং নামকরণের প্রক্রিয়া ও গণশুনানি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়। সংসদে জবাব দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক যাচাই–বাছাই ও গণশুনানির মাধ্যমে নাম নির্ধারণ করেছেন এবং স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। নিজের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়াকে তিনি কাকতালীয় বলে উল্লেখ করেন। তবে প্রতিমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
সামাজিক মাধ্যমে আরও প্রতিক্রিয়া
ইরফান শেখ নামের এক ব্যবহারকারী গতকাল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শাহে আলমের তুঘলকি কাণ্ড দেখে সারা দেশ বিস্মিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিস্মিত। তিনি শাহে আলমের পুত্রদ্বয়ের নামে করা দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের আদেশ দিয়েছেন।’ তিনি আরও লেখেন, ‘এই শাহে আলমকে নিয়েই ঈদের দিন প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি চালিয়ে সারা শহর ঘুরেছেন। বর্জ্য অপসারণের অগ্রগতি তদারকি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও শাহে আলম একই এলাকার লোক। তাঁরা ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু এতগুলো বছরেও শাহে আলমকে চিনতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী…।’
অন্যদিকে সংসদে ইউনিয়নের নামকরণকে প্রতিমন্ত্রী নিজেই ‘মিরাকল’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির মিডিয়া সেলের একটি পোস্ট শেয়ার করে লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আরিফ জেবতিক লিখেছেন, ‘যাক, লোকটাকে থামানো গেছে! মিরাকল!’
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
এমন সমালোচনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাম বদলের নির্দেশ দেন। বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মৌখিকভাবে নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। নাম পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর থেকে দাপ্তরিক চিঠি আসতে পারে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, নতুন নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ইউনিয়নগুলোয় নতুন করে গণশুনানি করা হবে বলে গতকাল প্রথম আলোকে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘ইউএনও সাহেব আবার গণশুনানি করবেন। যেখানে যেখানে নাম পরিবর্তনের বিষয় আছে, সেই ইউনিয়নগুলোয় নতুন করে তারিখ দেওয়া হবে। ওই তারিখে সবাই উপস্থিত হবেন। গণশুনানির মাধ্যমে যে নাম উঠে আসবে, সেটাই হয়তো করা হবে।’



