বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি। বরং আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৩ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৮৯তম সভায় অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল করা হয়। ২৫ জুন বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরে।
পূর্ববর্তী নিয়োগের বিবরণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে ৩ বছরের জন্য ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ওই নিয়োগে তিনি মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসাসুবিধা ও সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা পেতেন এবং এটি বিধি অনুযায়ী হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আপত্তি ছিল না।
অধ্যাদেশ সংশোধন ও বিতর্ক
তবে তার নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে, ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায় ইমেরিটাস অধ্যাপক অধ্যাদেশ সংশোধন করে আজীবন নিয়োগ, পূর্ণকালীন অধ্যাপকের অবসরের সময়কার বেতন-ভাতার সমপরিমাণ পারিশ্রমিক, আজীবন চিকিৎসাসুবিধা, স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত করা হয়। বিএমইউর ভাষ্য, বাজেট অধিবেশনের মূল এজেন্ডার বাইরে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন নজিরবিহীন ও বেআইনি। এতে প্রতীয়মান হয়, একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল। এ পর্যন্ত তিনি এ খাতে আনুমানিক সাড়ে ১৪ লাখ টাকার বেশি গ্রহণ করেছেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম
বিশ্ববিদ্যালয় আরও দাবি করেছে, ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে উপস্থাপন, উপাচার্যের গঠিত মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশসহ যে প্রক্রিয়া অনুসরণের বিধান রয়েছে, ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। কেবল একজন সদস্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাকে আজীবনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক।
কর্মস্থলে অনুপস্থিতি
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নিয়োগের পর প্রায় দুই বছর তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে আসেননি, শিক্ষাদান করেননি এবং কোনো গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়েও প্রশাসনকে অবহিত করেননি। তবে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।
আর্থিক সুশাসনের প্রশ্ন
বিএমইউর মতে, ২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে একটি সম্মানসূচক পদ কার্যত বেতনসদৃশ আর্থিক সুবিধাসংবলিত পদে পরিণত হয়। অথচ এ পরিবর্তনের আগে অর্থ কমিটির সুপারিশ বা কোনো আর্থিক বিশ্লেষণের তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে পাওয়া যায়নি, যা আর্থিক সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একই সভায় অধ্যাদেশ সংশোধন করে তাৎক্ষণিকভাবে সেই সংশোধিত বিধানের সুবিধা প্রয়োগ করা প্রশাসনিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত এবং এতে আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সিন্ডিকেট গত ১৩ জুনের সভায় ২০২৪ সালের ২৪ জুন দেওয়া অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক পদে নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত হিসেবে বাতিল করে।
অর্থ ফেরতের দাবি
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিধি অনুযায়ী কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়াগত বা আইনগত ত্রুটির কারণে বাতিল হলে সেই নিয়োগের ভিত্তিতে দেওয়া আর্থিক সুবিধাও পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রয়েছে। সে অনুযায়ী তার কাছে বেতন বাবদ নেওয়া অর্থ ফেরত চাওয়া হয়েছে। এটি প্রচলিত আইনের বিধান, কাউকে হয়রানি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য নয়। বিএমইউর দাবি, ইমেরিটাস অধ্যাপক পদে ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর আজীবন নিয়োগ বাতিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা।



