ঘুসকাণ্ডে অব্যাহতি পাওয়া সহকারী এটর্নি জেনারেলের রাজনৈতিক দ্বৈত পরিচয়
ঘুসের অভিযোগে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সহকারী এটর্নি জেনারেল মো. আবুল হাসানের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তিনি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে হলেও নিজে আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত।
নিয়োগ বাতিল ও অভিযোগের বিস্তারিত
সোমবার (৬ এপ্রিল) অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল নিশ্চিত করেছেন যে, মো. আবুল হাসানের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগকারী রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. সারোয়ার খালেদ, যিনি সিলিকন রিয়েল এস্টেট (প্রাইভেট) লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে আবুল হাসানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।
সারোয়ার খালেদের অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা একটি রিট পিটিশনে ২০২৪ সালের ২৬ মে হাইকোর্ট সিলিকন রিয়েল এস্টেটের বিরুদ্ধে রুল ও নির্দেশনা জারি করে। সেই রুল তিন মাসের মধ্যে খারিজ করিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে সহকারী এটর্নি জেনারেল আবুল হাসান ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা নেন। পূর্ব পরিচিত আইনজীবী মো. ফখরুল ইসলামের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নগদ টাকা দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক দ্বৈত অবস্থান ও পারিবারিক প্রভাব
আবুল হাসানের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন ধারার। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় (১২ মার্চ) আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের হাত ধরে দলীয় ফরম পূরণের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক অভিষেক হয়। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মেহের উদ্দিনের সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন এবং নিজ কেন্দ্রে ভোট সংগ্রহে ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং সক্রিয় সদস্য হিসেবে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার তদবিরে সহকারী এটর্নি জেনারেলের পদটি পান। স্থানীয় রাজনীতি, আইনজীবী ও প্রতিবেশীদের মতে, পরিবারটি রাজনৈতিক পালাবদলের প্রতিটি ধাপে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি অবস্থান বজায় রেখেছে।
অভিযোগকারীর বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
সারোয়ার খালেদ দাবি করেন, টাকা নেওয়ার এক বছর পার হলেও আবুল হাসান মামলায় কোনো পদক্ষেপ নেননি। বারবার তাগাদা দিলেও তিনি বিভিন্ন অজুহাতে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে অন্য আইনজীবী নিয়োগের জন্য মামলার অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া হলেও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। আপসের চেষ্টা করেও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে আবুল হাসান প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে তার আস্থা অর্জন করেন এবং দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন। হাইকোর্ট বন্ধ হওয়ার আগে জরুরি ভিত্তিতে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। সারোয়ার আর্থিক সংকটের মধ্যেও ধারদেনা করে একাধিক কিস্তিতে বিপুল অর্থ দেন, যার বেশিরভাগ নগদে আদালত সম্পৃক্ত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। তার অফিসের কর্মীরা এই লেনদেনের সাক্ষী এবং লেজারে তারিখসহ হিসাব রয়েছে।
বাবার প্রতিক্রিয়া ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য
এ ব্যাপারে আবুল হাসানের বাবা দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ঘটনাটি চক্রান্তমূলক। তিনি দাবি করেন যে, আবুল হাসান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। অন্যদিকে, নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, আবুল হাসানকে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর সন্তোষজনক না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় মানিকগঞ্জের দৌলতপুর এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে, যেখানে পরিবারটির রাজনৈতিক দ্বৈত অবস্থান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, যেই দল ক্ষমতায়, সেই ঘরেই তাদের অবস্থান, ফলে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারটি ‘সেফ জোনে’ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।



