ফরিদপুর মেডিকেল পর্দা কেলেঙ্কারি: আদালতের রায়ে ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের আলোচিত ‘পর্দা কেলেঙ্কারি’ মামলায় আদালত ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন এবং অপর ছয় আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন। সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে ফরিদপুরের বিশেষ জজ আদালতে এই মামলার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ গঠন ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিরা
অভিযোগ গঠন করা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার আবদুল্লাহ আল মামুন, মুন্সি ফররুখ হোসেন, মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন, মো. আলমগীর কবির এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষক ডা. বরুণ কান্তি বিশ্বাস ও ডা. মো. এনামুল হক।
অন্যদিকে, অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের (ফমেক) সাবেক অধ্যাপক ডা. শেখ আবদুল ফাত্তাহ, সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান, মো. ওমর ফারুক, মো. আলমগীর ফকির, মো. আবদুস সাত্তার ও মিয়া মোর্তজা হোসেন।
আদালতের সিদ্ধান্ত ও আইনজীবীদের বক্তব্য
দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী সিনিয়র অ্যাডভোকেট শেখ কুবাদ হোসেন বিষয়টির সত্যতা প্রকাশ করে বলেন, “আদালত পর্যবেক্ষণে ছয়জন আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন এবং অপর ছয় আসামিকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন। আমি দুদকের মামলার অ্যাডভোকেট হিসেবে সার্টিফাইড কপি তুলে দুদকের কাছে দেব। তারা পরবর্তী মতামত জানাবেন।”
এ মামলায় অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট টিএম শাকিল হাসান, হাইকোর্ট বিভাগের অ্যাডভোকেট আরফান সুলতানা ওটিএম আবিদ হাসান এবং ফরিদপুর জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এমএ সামাদ।
কেলেঙ্কারির পটভূমি ও আর্থিক অনিয়ম
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে ফরিদপুর মেডিকেলের জন্য অনিক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০টি পণ্য সরবরাহের জন্য ১০ কোটি টাকার একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অপ্রয়োজনীয় ওই সব সরঞ্জাম বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি ধরে ১০ কোটি টাকার বিল জমা দেওয়া হয়, তবে শেষ মুহূর্তে মন্ত্রণালয় বিল অনুমোদন না করায় তা আটকে যায়।
ওইসব সরঞ্জাম সরবরাহের পর জমা দেওয়া বিলে আইসিইউতে ব্যবহৃত একটি পর্দার দাম (এক সেট) ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়। একটি অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্টের খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এছাড়া একটি ভ্যাকুয়াম প্ল্যান্ট ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি বিএইইস মনিটরিং প্ল্যান্ট ২৩ লাখ ৭৫ হাজার, তিনটি ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন ৩০ লাখ ৭৫ হাজার এবং একটি হেড কার্ডিয়াক স্টেথিসকোপের দাম এক লাখ ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
অনুসন্ধান ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ
ওই সময়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান তিনটির মালিক তিন ভাই। তৎকালীন ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসাইন মূলত প্রতিষ্ঠান তিনটি চালান। তার দুই ভাই মুন্সী ফররুখ হোসাইন ও আবদুল্লাহ আল মামুনের নামে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। কাগজকলমে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও মুন্সী সাজ্জাদই ছিলেন ওই টেন্ডারের মূল নিয়ন্ত্রক। তিনিই সিন্ডিকেট করে সাজানো দরপত্র দাখিল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফরিদপুর মেডিকেলের ওই সময়ের তত্বাবধায়ক ওমর ফারুক খান (মৃত) শিডিউলভুক্ত সরঞ্জাম কেনা ও বাজার যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দন্ত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গণপতি বিশ্বাসকে সভাপতি এবং গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট মিনাক্ষী চাকমা ও প্যাথলজি বিভাগের এএইচএম নুরুল ইসলামকে সদস্য করে ওই কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির ভূমিকা ও সরকারি ক্ষতি
তিনটি দরপত্রের মূল্য যাচাই করে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয় এবং তত্ত্বাবধায়কের নেতৃত্বে কারিগরি কমিটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে অনিক ট্রেডার্সকে সর্বনিম্ন দরপত্রদাতা হিসেবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার পর অনিক ট্রেডার্স ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মালামাল সরবরাহ করে এবং সাত কোটি ৬০ লাখ টাকা ও দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার দুটি বিল মিলিয়ে ১০ কোটি টাকার বিল জমা দেয়।
ওই সময়ের সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য যৌক্তিক কারণ এবং চাহিদা ছাড়াই সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নেন। কমিটির সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে দর যাচাই ছাড়াই তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে ভুয়া দর দেখিয়ে ওই সব সরঞ্জামের উচ্চমূল্য দেখিয়ে প্রতিবেদন জমা দেন।
বাজারদর কমিটির মাধ্যমে মেডিকেল যন্ত্রপাতির অতিমূল্যায়ন, সরকারি আর্থিক ক্ষতি করে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য ঠিকাদার সিন্ডিকেট উচ্চমূল্যে দরপত্র দাখিল ও কার্যাদেশ নেন। হাসপাতালের জন্য অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা ও কেনাকাটার নিয়ম লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ১০টি আইটেম কেনা দেখিয়ে সরকারের ১০ কোটি টাকা ক্ষতির চেষ্টা করে আত্মসাতের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।



