কক্সবাজারে মা-মেয়েকে মারধর ও সাজা: আদালতের তলব, দুটি তদন্ত কমিটি গঠন
মা-মেয়েকে মারধর ও সাজা: আদালতের তলব, তদন্ত কমিটি

কক্সবাজারে মা-মেয়েকে মারধর ও সাজা: আদালতের তলব, দুটি তদন্ত কমিটি গঠন

কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় মা ও তার কলেজপড়ুয়া মেয়েকে আটক রেখে মারধর এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে। ঘটনায় পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশনা ও তদন্ত প্রক্রিয়া

কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আজম গত ৮ মার্চ এক আদেশে পেকুয়া থানার ওসিকে আগামী ১৬ মার্চ আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে এ ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

গত ৪ মার্চ ঘুসের টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে পেকুয়া থানার ভেতরে পুলিশ কর্তৃক দুই নারীকে মারধর এবং পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে তাদের এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ঘটে। দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশনা দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঘটনার বিবরণ ও দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া

গত ৬ মার্চ ‘ঘুসের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা–মেয়েকে মারধর এসআইয়ের, এক মাসের কারাদণ্ড’ শিরোনামে অনলাইনে এবং পরদিন প্রিন্ট সংস্করণে একই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। একপর্যায়ে ৭ মার্চ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই দুই নারীর সাজা বাতিল করে মামলার দায় থেকে তাদের বেকসুর খালাস দেন।

নির্মম ঘটনার শিকার দুই নারী হলেন- রেহেনা মোস্তফা (৪২) ও তার মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১)। আইনজ্ঞদের মতে, থানার ভেতরে দুই নারীকে নির্যাতনের অভিযোগ এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনা আইনের গুরুতর ব্যত্যয়। তাদের দাবি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঘটনা না ঘটলেও রক্তাক্ত অবস্থায় ওই নারীদের সাজা দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আদালতের বিস্তারিত আদেশ ও আইনি বিশ্লেষণ

আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, ঘটনার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা, থানায় রুজুকৃত জিডি বা মামলা, আটক করার কারণ এবং পরবর্তীতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য উপস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। এছাড়া ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেফতার সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, থানার সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ওসির ব্যাখ্যা সম্বলিত ভিডিও বার্তা থেকে প্রতীয়মান হয়- অভিযুক্ত নারীরা থানায় এসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর তাদের আটক করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে আদালত বলেন, যদি সত্যিই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে সেটি সরকারি কর্তব্যে বাধা বা সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলার মতো আমলযোগ্য অপরাধ। সেক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী নিয়মিত মামলা রুজু করা এবং আইনানুগ তদন্ত শুরু করা পুলিশের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল।

আদালত আরও বলেন, মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। পূর্বে গ্রেফতার বা আটক করা ব্যক্তিকে ওই আইনে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই। হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়ের উল্লেখ করে আদালত বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগে পুলিশ যদি কাউকে গ্রেফতার করে, তাহলে তাকে ওই আইনে সাজা দেওয়ার সুযোগ নেই। এভাবে সাজা দিলে পুরো কার্যক্রমই অবৈধ ও এখতিয়ারবহির্ভূত বলে গণ্য হবে।

প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত কমিটি

কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির এমএই শাহজাহান নূরী বলেন, মা–মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আগামী ১৬ মার্চ হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি খাইরুল আলম উল্টো দুই নারীর বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম যুগান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা–মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পর প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান জানান, দুই নারীকে সাজা দেওয়ার ঘটনায় কোনো প্রশাসনিক ব্যত্যয় ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব জানান, মা–মেয়ের রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনার তদন্তে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পটভূমি ও অভিযোগের বিবরণ

২০১৩ সালে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ নিয়ে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তারা। কিন্তু তখন জুবাইদাকে অস্বীকার করা হয় বলে অভিযোগ করেন রেহেনা। পরে আদালতের মাধ্যমে জুবাইদা সম্পত্তির দাবিতে মামলা করেন। ওই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পেকুয়া থানাকে।

এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পল্লব কুমার ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে তিনি রেহেনা ও জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তারা ২০ হাজার টাকা দেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘুস নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে মিথ্যা প্রতিবেদন দেন এসআই পল্লব। এ কারণে টাকা ফেরত চাইতে গেলে থানায় মা–মেয়ের সঙ্গে পুলিশের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের মারধর করে বলে অভিযোগ করেন তারা। পরে ইউএনওকে ডেকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা–মেয়েকে এক মাসের সাজা দেওয়া হয়।