পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর সরকার গড়লেও এবার ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির দাবি, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম কেটে দেওয়ার ফলে অন্তত ৩১টি আসনের ফলাফল সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। এই আসনগুলোতে ২০২১ সালে তৃণমূল জিতলেও এবার সেখানে জয় পেয়েছে বিজেপি।
শুনানি ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। তৃণমূলের সাংসদ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে জানান, নাম বাদ যাওয়া ৩১টি আসনের প্রতিটিতেই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা তৃণমূলের গতবারের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি আসনের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তৃণমূল প্রার্থী মাত্র ৮৬২ ভোটে হেরেছেন, অথচ সেখানে তালিকা থেকে ৫ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
আপিল আবেদনের জট
পুরো রাজ্যের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান যেখানে প্রায় ৩২ লাখ, সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করা প্রায় ৩৫ লাখ আবেদন এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী আদালতে জানান, যে হারে এই আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে, তাতে বর্তমান জট কাটাতে প্রায় চার বছর সময় লেগে যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
নির্বাচন কমিশন অবশ্য তৃণমূলের এই অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। বিজেপির সঙ্গে আঁতাত করে ফল পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করে কমিশন নিজস্ব তথ্য পেশ করেছে। কমিশনের দাবি, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ বেল্টের যেসব আসনে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে, সেখানে মানুষ তৃণমূলকেই ভোট দিয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সুজাপুরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এ ছাড়া রঘুনাথগঞ্জে ১ লাখ ৩০ হাজার, সামশেরগঞ্জে ১ লাখ ২৫ হাজার, রতুয়ায় ১ লাখ ২৩ হাজার এবং সুতিতে ১ লাখ ২০ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। কিন্তু এই পাঁচটি আসনেই তৃণমূল কংগ্রেস জয়লাভ করেছে বলে কমিশন যুক্তি দেখায়।
আদালতের নির্দেশনা
শুনানি শেষে আদালত পর্যবেক্ষণ দেয় যে, যদি কোনও আসনে জয়ের ব্যবধান এতটাই কম হয় যা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের ভোটের মাধ্যমে বদলে যেতে পারত, তবে সংক্ষুব্ধ দল চাইলে সুনির্দিষ্ট পিটিশন দাখিল করতে পারে। এর আগে নির্বাচন কমিশনও এ ধরনের পিটিশন দাখিলের সুযোগের কথা জানিয়েছিল।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
এবারের নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জিতে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। দীর্ঘ ১৫ বছর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকে হটিয়ে এই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। নির্বাচনের প্রচারের মূল ইস্যুই ছিল এসআইআর এবং অনুপ্রবেশকারী ইস্যু। বিজেপির অভিযোগ ছিল, তৃণমূল ভোটের স্বার্থে অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা দিচ্ছে। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি ছিল, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি যোগসাজশ করে লাখ লাখ প্রান্তিক ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করেছে।



