ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রেমের বিয়ে, দাম্পত্য কলহ ও একটি মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। মোটরসাইকেল ফেরত আনতে গিয়ে রবিউল ইসলাম (৩৬) নামে এক যুবক খুন হয়েছেন। হত্যার পর ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ বুধবার (৬ মে) এই ঘটনায় চারজনকে আটকের তথ্য জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।
ঘটনার বিবরণ
এর আগে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে উপজেলার ময়না ইউনিয়নের হাটখোলারচর গ্রামের সাতৈর-মহম্মদপুর সড়কের বটতলা সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রবিউল ইসলাম মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার সিন্ধাইন গ্রামের গোলাম সরোয়ার শেখের ছেলে। তিনি পেশায় ট্রাক্টর চালক ছিলেন। তার স্ত্রী ও ১১ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
প্রেমের বিয়ে ও কলহ
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের জেরে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন বোয়ালমারীর হাটখোলারচর গ্রামের শহিদুল শেখ ও মাগুরার সাইদ মোল্লার মেয়ে। বিয়ের পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা ভালো যাচ্ছিল না। সম্প্রতি ঝগড়ার জেরে স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে যান। এরই মধ্যে শহিদুল তার শ্যালকের একটি মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়ে অন্যত্র বন্ধক রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে।
মোটরসাইকেল ফেরত নিতে গিয়ে হত্যা
গত মঙ্গলবার দুপুরে শ্বশুর সাইদ মোল্লা প্রতিবেশী রবিউল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তার মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি হাটখোলার চর গ্রামে আসেন মোটরসাইকেল ফেরত নিতে। এ সময় মোটরসাইকেল দেওয়া-না-দেওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে তর্ক হয়। পরে তারা মোটরসাইকেল না নিয়েই ফিরে যান। তবে বিকেলে শহিদুল আবার ফোন করে মোটরসাইকেল দেওয়ার কথা বলে তাদের ডেকে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এটাই ছিল পরিকল্পিত ফাঁদ। দ্বিতীয়বার এসে শ্বশুর সাইদ মোল্লাকে স্থানীয় এক মাতুব্বরের বাড়িতে বসিয়ে রাখা হয় এবং কৌশলে রবিউল ইসলামকে আলাদা করে বাড়ির বাইরে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শহিদুল মোবাইলে শ্বশুরকে বলে, ‘আপনি চলে যান, কাল সকালে মোটরসাইকেল পৌঁছে দেওয়া হবে।’ এরপর থেকেই নিখোঁজ হয়ে যান রবিউল।
মরদেহ উদ্ধার
রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই সড়কের পাশে একটি প্রাইভেটকার খাদে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা এগিয়ে যান। গাড়িটি উদ্ধারের সময় পাশেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা একটি মরদেহ দেখতে পান তারা। পরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়—তিনি নিখোঁজ রবিউল ইসলাম। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে থাকা প্রাইভেটকারে ৪-৫ জন যুবক ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন পালিয়ে যায় এবং শাহাজাদা (২৩) ও তপু সাহা (২২) নামে দুইজনকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। স্থানীয়দের ধারণা, হত্যার পর মরদেহ ফেলে পালানোর সময় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়।
পলাতক অভিযুক্ত
ঘটনার পর থেকে মূল অভিযুক্ত শহিদুল শেখ ও তার পরিবারের সদস্যরা পলাতক রয়েছে। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। নিহতের বাবা গোলাম সরোয়ার শেখ বলেন, আমার ছেলেকে মোটরসাইকেল আনতে নিয়ে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।
পুলিশের বক্তব্য
বোয়ালমারী থানার ওসি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে। মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আজম খান জানান, প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মোটরসাইকেল সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাইভেটকারটির ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।



