ঢাকা বারে জামায়াত-এনসিপির ভরাডুবি, নীল প্যানেলের জয়
ঢাকা বারে জামায়াত-এনসিপির ভরাডুবি, নীল প্যানেল জয়ী

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আইনজীবী সংগঠন ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬-২০২৭ কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। দুই দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ শেষে শুক্রবার (১ মে) রাতে ফলাফল ঘোষণা করা হলে দেখা যায়—জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সমর্থিত ‘সবুজ প্যানেল’ বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। বিপরীতে বিএনপি ও গণঅধিকার সমর্থিত ‘নীল প্যানেল’ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদের সবকটিতে জয় পেয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে।

ভরাডুবির কারণ

এই ভরাডুবির কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এসব মতামত ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে এসেছে। দীর্ঘ দুই দশক জামায়াত ও বিএনপি একই প্যানেলে নির্বাচন করলেও এবার সেই জোট ভেঙে আলাদা প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ফলে দুই পক্ষের ভোট বিভক্ত হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তাদের বড় একটি অংশ ভোটদান থেকেও বিরত ছিলেন। কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে গেলে ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কায় যাননি বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে বিএনপির একটি শক্তিশালী নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। অতীতে জোটগত নির্বাচনে এমন ভরাডুবি না হলেও এবার আলাদা লড়াইয়ে সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জামায়াতের অভিযোগ

জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের অভিযোগ, নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে বিএনপি জয় পেয়েছে। তবে বিএনপিপন্থিরা এ অভিযোগ নাকচ করে বলছেন, অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকার কারণেই জামায়াত কিছু আসনে জয় পেত, তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক তেমন শক্তিশালী নয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের একটি অংশের মতে, জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা থাকায় শিক্ষিত আইনজীবীদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম বলেন, জামায়াত কখনও স্বতন্ত্রভাবে শক্তিশালী নির্বাচন করেনি। আগে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় সীমিতসংখ্যক পদে প্রার্থী দিত এবং জোটগত সুবিধা পেত। তার দাবি, জামায়াতের নিজস্ব ভোট হাজারের বেশি নয়, যেখানে বিএনপির ভোটব্যাংক কয়েক হাজার। এছাড়া আদর্শগত কারণে অনেক আইনজীবী তাদের সমর্থন দেন না। কারচুপির অভিযোগকে তিনি ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অপরদিকে জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিনের দাবি, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তার অভিযোগ, নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় পক্ষপাত ছিল, আইডি কার্ড ছাড়া ভোটগ্রহণ হয়েছে এবং জাল ভোটের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এ বিষয়ে নির্বাচনকালীন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়নি।

বিএনপিপন্থি আইনজীবী জাকির হোসেন জুয়েল বলেন, সবুজ প্যানেলের অনেক প্রার্থীই আইনজীবীদের কাছে অপরিচিত ছিলেন এবং নিয়মিত পেশাগত কার্যক্রমেও সক্রিয় নন। ফলে সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও আস্থা কম ছিল।

আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরন বলেন, আদর্শগত কারণে অনেক আইনজীবী জামায়াতকে সমর্থন করেন না। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাদের সমর্থকরা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় ভোটার উপস্থিতিও কমেছে।

ভোটার উপস্থিতি

নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ২০ হাজার ৭৮৫ জন আইনজীবী। এর মধ্যে দুই দিনে ভোট দিয়েছেন ৭ হাজার ৬৯ জন, যা মোট ভোটারের ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৬ শতাংশ ভোটার ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।

কম ভোটার উপস্থিতির কারণ হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট মো. বোরহান উদ্দিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বৈরী আবহাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় আইনজীবীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

নির্বাচনে বিএনপি ও গণঅধিকার সমর্থিত নীল প্যানেল এবং জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সমর্থিত সবুজ প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কোনও প্যানেল অংশ নেয়নি। তাদের দাবি, অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় সমর্থকেরা ভোটদান থেকেও বিরত ছিলেন।

তবে ভোট দেওয়া সাধারণ আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করেন, সরকারপক্ষের সঙ্গে সঙ্গতি থাকলে সমিতির উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে—এমন বিবেচনায় তারা বিএনপিপন্থি প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন।