সাংবাদিকদের স্বাধীনতা: সংকট ও প্রশ্ন
সাংবাদিকদের স্বাধীনতা: সংকট ও প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বারবারই একটি কথা শোনা গেছে— দেশের ইতিহাসে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছেন। যখন এই কথা শোনা যাচ্ছিল, তখন ২৬৬ জন সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামি। অনেক সাংবাদিক গ্রেফতারের ভয়ে দেশ ছেড়ে পলাতক। বেশির ভাগ টেলিভিশন চ্যানেল দখল, অসংখ্য সাংবাদিক চাকরি ছাড়া। মব সন্ত্রাসের মুখে শীর্ষ কয়েকজন সাংবাদিক। এর আগেই জেলে যেতে হয়েছে অনেককে। তবু এসব কথা অনেকে বলেছেন। আমরা শুনেছি। অন্ধকেও হয়তো রাস্তা দেখানো সম্ভব, কিন্তু যে চোখ বন্ধ করে রাখে, তাকে কিছু দেখাতে চাওয়াটা বোকামি। সেই বোকামি এই দেশে বেঁচে-বর্তে থাকা সাংবাদিকরা করেননি। কিছু সাংবাদিক ভয়ে, আর কিছু তাদের সমর্থনে ছিলেন বলে।

আরএসএফ সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

সাংবাদিকরা না বললেও তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) বলছে, ২০২৬ সালের সূচকে গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম। কেন এই অবস্থা সাংবাদিকদের, অনেকবার তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থাকবে না, মূল কথা এটি। এই আলোচনা অনেক বছর ধরেই চলছে, হয়তো চলবে আরও কয়েক যুগ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানামুখী হয়রানি

তবে সাংবাদিকরা হত্যা মামলার আসামি, বিনা বিচারে বন্দি, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তলব বা জব্দ, বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল— এমন হরেক রকম ক্রিমিনাল অ্যাক্টে বন্দি করার নজির এ দেশে খুব কমই। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তা হয়েছে ব্যাপক বিধ্বংসী আকারে। ১৬ বছরে শেখ হাসিনা শাসনামলে চেহারা দেখা গেছে বা একটু নাম হয়েছে, এমন সাংবাদিকরা কোনো হেনস্তা থেকে মুক্তি পাননি। বিষয়টি এমন— এই সব সাংবাদিকের বেড়ে ওঠা, বড় হয়ে ওঠা, জনপ্রিয় বা অজনপ্রিয় হওয়ার দায় বা কৃতিত্ব কেবল শেখ হাসিনার। সাংবাদিকদের কারও জন্য একটি চাকরি জোগাড় করা বা বড় পদে বসাটা হয়তো তদবিরে হয়, বা সরকারের সুদৃষ্টির ফলে। কিন্তু সাংবাদিক পরিচিত হয়ে ওঠে তারই কাজ দিয়ে। ১৬ বছরে বেড়ে ওঠা প্রায় সব সাংবাদিক শেখ হাসিনার দোসর— এই তকমা দিয়ে তাদের জেলে পাঠানো, চাকরিচ্যুত করা, অ্যাকাউন্ট জব্দ, বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা, এমন কোনো হেনস্তা নাই যা করা হয়নি। কেন? তারা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী দোসর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক সমর্থন কি শাস্তিযোগ্য?

ধরে নিলাম এই সব সাংবাদিক আওয়ামী লীগের। এখন আসি ‘কোনো দল বা ব্যক্তি বিশেষকে সমর্থন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’— এমন কোনো আইন আছে কিনা। আমি জানি, শুধু এ দেশ নয়, বিশ্বজুড়ে এই আইন নেই। উন্নত দেশগুলোতে সরকারের সমর্থনে যেমন মিডিয়া আছে, সরকারের বিপক্ষেও আছে। এই দেশে এনটিভি, বাংলাভিশন বা চ্যানেল ওয়ানকে যেমন বিএনপির চ্যানেল বলা হতো— তেমনই সময়, একাত্তরকে বলা হতো আওয়ামী চ্যানেল। কোনো রাখডাক করে না, তাদের কার্যক্রমে তা-ই প্রকাশিত হতো। দলীয় সমর্থন আছে জেনেও তাদের বক্তব্য কেউ গ্রহণ করবে কী করবে না, এটি একান্তই সেই মানুষের অভিরুচি। তবে এসব চ্যানেলের সাংবাদিকরা (গুটিকয়েক) যদি রাজনৈতিক দলের ধারক-বাহক হয়, তাহলে কি তারা শাস্তিযোগ্য? তাদের কীভাবে আইন শাস্তির আওতায় আনা হবে?

যেহেতু কাউকে সমর্থন এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়, এই দেশে সে আইন নেই— ফলে সাংবাদিকদের আটক করা হচ্ছে খুনের মামলায়, দুদকের মানিলন্ডারিং মামলা, অবৈধ বা অপ্রকাশিত আয়ের মামলায়।

ভবিষ্যৎ আতঙ্ক

জেল, হেনস্তা, ভীতি নানাভাবে মানসিক বা শারীরিক শাস্তির মধ্যে রাখা হচ্ছে সাংবাদিকদের। এই শাস্তি কি কেবল এক মেয়াদে শেষ হবে? এমন না। সরকার পরিবর্তন হয়, চলে যাওয়া সরকারের সমর্থক সাংবাদিকরা পড়েন বিরাট বিপদে। একসময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতো, এখন সাংবাদিকরা সরাসরি আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এই যে উদাহরণ তৈরি হলো— এখন থেকে এমন হবে যে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকরা জেল খাটবে। এই আতঙ্ক নিয়ে সরকারের সমর্থনে কি আসলে কেউ ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে? যদি না করে, তবে সব সাংবাদিক সরকারের খুঁত বের করতে থাকবে। সব সাংবাদিককে কি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তখন? সব সরকারই চায়, তার সমর্থনে কিছু সাংবাদিক বা মিডিয়া থাকুক। যদি রাখতে চান, তবে সরকার পরিবর্তনের পর এই সব মিথ্যা মামলা, শাস্তি, জেল— এসব থেকে তাদের মুক্ত রাখুন। নতুবা একটি আইন করুন, যেখানে কোনো সাংবাদিককে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে মামলা, গ্রেফতার, অজামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হবে।

লেখক: সাংবাদিক