আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্রাগার থেকে চায়না রাইফেলের গুলি ও সিসা গুলি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনায় জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের বেতার কনস্টেবল নাহিদ মিয়া।
জবানবন্দির বিবরণ
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গণ-অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ১২তম সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন নাহিদ মিয়া। তিনি বর্তমানে যাত্রাবাড়ী থানায় বেতার অপারেটর হিসেবে কর্মরত। জবানবন্দিতে তিনি ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের কয়েকটি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
১৮ জুলাইয়ের ঘটনা
জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় তৎকালীন এসি (ডেমরা জোন) নাহিদ ফেরদৌস ওয়্যারলেসে সিসা গুলি চান। বিষয়টি তিনি তৎকালীন ওসি (যাত্রাবাড়ী) আবুল হাসানকে জানালে লোকবলের অভাবে তাঁকে গুলি নিয়ে যেতে বলা হয়। নাহিদ মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নিরুপায় হয়ে’ তিনি থানার সামনে থেকে ২০০টি সিসা গুলি এসি নাহিদ ফেরদৌসের কাছে পৌঁছে দেন।
১৯ জুলাইয়ের ঘটনা
পরদিন ১৯ জুলাইও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নাহিদ মিয়া। ওই দিন যাত্রাবাড়ী মাছবাজার-সংলগ্ন আউটগোয়িং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ (এসি ট্রাফিক ডেমরা) ওয়্যারলেসের চায়না রাইফেলের গুলি চান এবং মাছবাজার-সংলগ্ন ইনকামিং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির চায়না রাইফেলের গুলি চান। নাহিদ মিয়া বলেন, বিষয়টি ওসিকে জানালে তিনি অস্ত্রাগার থেকে গুলি দিতে নির্দেশ দেন। বারবার নিষেধ করার পরও নির্দেশ থাকায় তিনি অস্ত্রাগার থেকে ৪০০টি গুলি নেন। এর মধ্যে ৩০০টি পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ ও ১০০টি ইন্সপেক্টর জাকিরের কাছে পৌঁছে দেন। গুলি নিয়ে যেতে দেরি হওয়ায় ওয়্যারলেসে পার্টি কমান্ডারদের অশোভন কথাবার্তার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এই কনস্টেবল।
তাইম হত্যার ঘটনা
জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, পরে ২০ জুলাই তিনি কানাঘুষায় জানতে পারেন, ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ইন্সপেক্টর জাকির একজনকে গুলি করে হত্যা করেছেন। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে তিনি সেই ঘটনার ভিডিও দেখেন। ওই ভিডিওতে জাকিরকে গুলি করতে দেখা গেছে। যে ছেলেকে গুলি করা হয়েছে, তাঁর নাম তাইম।
মামলার বিবরণ
গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ইমাম হাসান তাইম রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজীনগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। এ মামলায় মোট ১১ জন আসামি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯ জন পলাতক এবং ২ জন কারাগারে। পলাতক আসামিরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক এসআই সাজ্জাদ উজ জামান। কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। আজ এই দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।



