সাড়ে ৯ বছরেও বিচার পাননি নুরুল ইসলাম, ৬০ তারিখে হাজিরা দিয়েও অধরা ন্যায়বিচার
সাড়ে ৯ বছরেও বিচার পাননি নুরুল ইসলাম, ৬০ তারিখে হাজিরা

মামলার খোঁজ নিতে আসা নুরুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ মোড়ের শ্রম আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায় তাঁকে। নিজের হৃদরোগের চিকিৎসা আর মেয়ের বিয়ের খরচ মেটাতে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সেই টাকা পাননি। পরে ২০১৬ সালের এপ্রিলে চাকরি ছেড়ে দিলেও মেলেনি প্রাপ্য পাওনা। শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। এরপর কেটে গেছে সাড়ে ৯ বছর। ৬৭ বছর বয়সী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মামলায় তারিখ পড়েছে ৬০টি, সাড়ে ৯ বছর ধরে আদালতে ঘুরছি।’ প্রতিটি তারিখে গ্রামের বাড়ি পটিয়া থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসে হাজিরা দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ এই আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি। মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন নুরুল ইসলাম। ক্লান্ত এই মানুষটি এখনো জানেন না, কবে তিনি তাঁর ন্যায্য পাওনা হাতে পাবেন।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শুরু

চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীর সাগরিকা এলাকায় কোস্টাল সি ফুডস লিমিটেডে এক্সপোর্ট ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন নুরুল ইসলাম। তাঁর বেতন ছিল ৩১ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে তাঁর করা মামলাটি চট্টগ্রামের প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন। চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় সরকারি ভবনে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রম আদালতের কার্যক্রম চলে। এই দুটি আদালতে বর্তমানে ২ হাজার ৫৩৯টি মামলা বিচারাধীন। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতের মামলা ১৫০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে বছরের পর বছর ধরে তা ঝুলে থাকে। মালিক-শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, সমন জারিতে দেরি, জবাব দাখিলে সময় নেওয়া এবং মতামত প্রদানে বিলম্ব—এসব কারণেই বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নুরুল ইসলামের চাকরির ইতিহাস

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের ১৩ জুলাই কোস্টাল সি ফুডস লিমিটেডে যোগ দেন নুরুল ইসলাম। দীর্ঘ ১৪ বছর চাকরি করার পর অসুস্থতা ও পারিবারিক প্রয়োজনের কারণে প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা চান তিনি; কিন্তু তা না পেয়ে পদত্যাগ করেন। এরপরও ন্যায্য পাওনা না পেয়ে আইনি লড়াইয়ে নামেন। মহান মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। কিন্তু নুরুল ইসলামের মতো অনেক শ্রমিকের অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকার আদায়ের পথ এখনো কঠিন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামলার ধাপে ধাপে অগ্রগতি

গত বুধবার চট্টগ্রামের শ্রম আদালত প্রাঙ্গণে কথা হয় নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল কারখানা কর্তৃপক্ষ তাঁকে দুটি চেকের মাধ্যমে আট মাসের বকেয়া ৮৩ হাজার ৯৫৬ টাকা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের তাঁর অংশ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪ টাকা দেয়; কিন্তু তিনি মনে করেন, প্রকৃত পাওনার তুলনায় তা কম। এরপর ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেন তিনি। কোনো জবাব না পেয়ে ৭ সেপ্টেম্বর প্রথম শ্রম আদালতে মামলা করেন। মামলায় চার মাসের বকেয়া মজুরি, ঈদ বোনাস, গ্র্যাচুইটি, অব্যবহৃত ছুটির টাকা এবং বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।

মামলা করার পর আদালত বিবাদীপক্ষকে হাজির হতে নোটিশ দেন। দুই মাস পর তারা হাজির হয়ে জবাব দেওয়ার জন্য সময় চায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বারবার সময় নেওয়ার মধ্যেই কেটে যায় প্রায় দুই বছর। ২০১৯ সালে বিবাদীপক্ষ মামলাটি খারিজের আবেদন করে। পরে আদালত সেটি মূল বিচারের সময় বিবেচনার জন্য রাখেন। এরপরও চলতে থাকে সময় নেওয়ার প্রবণতা। দেড় বছর পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিবাদীপক্ষ জবাব দাখিল করে। এতে দাবি করা হয়, নুরুল ইসলাম শ্রমিক হিসেবে বিবেচ্য নন, তাই মামলাটি চলতে পারে না। আদালত পরে চূড়ান্ত শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন।

শুনানির ধীর গতি

২০২১ সালে শুনানির দিন ধার্য হলেও কখনো বাদী, কখনো বিবাদীপক্ষ সময় নেওয়ায় কার্যক্রম এগোয়নি। পরে ২০২২ সালে প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব জমা দিতে আদালত নির্দেশ দিলে তা জমা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের জুনে নুরুল ইসলামের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বরে তাঁকে জেরা করা হয়। এরপর ধীরগতিতে মামলার কার্যক্রম চলতে থাকে। চলতি বছর বিবাদীপক্ষের আংশিক সাক্ষ্য হয়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখেও তারা সময় নেয়।

নুরুল ইসলামের ব্যক্তিগত ক্ষতি

চাকরি ছাড়ার পর নুরুল ইসলাম পটিয়ায় চলে যান। সেখান থেকে প্রতিটি তারিখে আদালতে হাজির হতে গিয়ে গত সাড়ে ৯ বছরে তাঁর অন্তত সাত লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে ব্যক্তিজীবনেও প্রভাব পড়েছে তাঁর। অর্থাভাবের কারণে হজে যেতে পারছেন না, পারিবারিক নানা কাজও আটকে আছে। নুরুল ইসলামের একটাই চাওয়া—মৃত্যুর আগে মামলার রায় দেখে যাওয়া।

আইনজীবীদের বক্তব্য

বিবাদীপক্ষের আইনজীবী ফারহানা আলম বলেন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে নুরুল ইসলাম আরও বেশি দাবি করছেন। আদালতই নির্ধারণ করবেন তিনি কত পাবেন। তিনি বলেন, মামলার তারিখ তিন মাস পরপর পড়ে, তবু দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে নুরুল ইসলামের আইনজীবী এস এম সাহাব উদ্দিন বলেন, ধার্য দিনে বারবার সময় নেওয়া এবং দীর্ঘ ব্যবধানে তারিখ পড়ার কারণে মামলাটি দীর্ঘায়িত হয়েছে। এতে বাদী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আইনের বিধান অনুযায়ী, ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

শ্রম আইন বিশেষজ্ঞের মতামত

শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহীন চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের পাওনা দ্রুত আদায়ের জন্য কারখানায় কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকা জরুরি। এতে মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং অনেক বিরোধ আদালতের বাইরে সমাধান সম্ভব হয়। শাহীন চৌধুরী আরও বলেন, শ্রম আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। অহেতুক সময় নেওয়া বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যৌথ দর–কষাকষির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সচেতনতা বাড়ানো দরকার।

সাড়ে ৯ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরে নুরুল ইসলামের এখন একটাই দাবি—আদালতের নির্দেশে তাঁর ন্যায্য পাওনা পাওয়া। তাঁর কথায়, ‘এত দিন ঘুরলাম, এখন অন্তত ন্যায়বিচারটা পাই।’