মহাকাশে বন্দুকের গুলি চালালে কী হয়? জানুন বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
মহাকাশে বন্দুক চালালে কী হয়? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা

একটু কল্পনার মাধ্যমে এই লেখা শুরু করা যাক। যেহেতু তুমিই কল্পনা করছ, তোমাকে আর বাদ দিই কীভাবে! ধরো, মহাকাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তুমি ভাসছ। হ্যাঁ, অবশ্যই কোনো মহাকাশযানে। তোমার পরনে বিশাল এক স্পেসসুট। কারণ তুমি এখনই মহাকাশযানের বাইরে যাবে। সঙ্গে থাকবে একটি সাধারণ বন্দুক। না, কাউকে ঘায়েল করতে হবে না। শুধু তোমার কৌতূহল মেটানোই উদ্দেশ্য।

মহাকাশে বন্দুক কি কাজ করবে?

মহাকাশযানের বাইরে গেলে, বন্দুকের ট্রিগার চেপে দিলে। পৃথিবীতে এমনটা করলে কান ফাটানো শব্দে একটা গুলি বেরিয়ে যেত। কিন্তু তুমি যেহেতু মহাকাশে আছ, তাই সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো কোনো বাতাস নেই, নেই মহাকর্ষের টান। এই অবস্থায় সেখানে কী ঘটবে? বন্দুকটা কি আদৌ কাজ করবে? কোনো শব্দ হবে? অন্তত গুলিটা কি বের হবে বন্দুক থেকে?

এত দিনে তুমি নিশ্চয়ই শিখেছ, আগুন জ্বলার জন্য অক্সিজেন খুব দরকার। পৃথিবীর বাতাসে প্রচুর অক্সিজেন আছে, তাই বন্দুকের ভেতরে বারুদ যখন জ্বলে ওঠে, তখন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু মহাকাশে তো কোনো অক্সিজেন নেই। তাহলে বন্দুকের ভেতরের বারুদে আগুন জ্বলবে কীভাবে?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিন্তার কোনো কারণ নেই, তোমার হাতের বন্দুকটি মহাকাশেও ঠিক পৃথিবীর মতোই কাজ করবে! কারণ, আধুনিক বন্দুকের গুলির ভেতরে শুধু বারুদই থাকে না, এর সঙ্গে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ মেশানো থাকে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে অক্সিডাইজিং এজেন্ট বা অক্সিডাইজার। এই রাসায়নিক পদার্থটি বারুদে আগুন জ্বালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। তাই মহাকাশে বাইরের কোনো অক্সিজেন না থাকলেও, বারুদে ঠিকই বিস্ফোরণ ঘটবে এবং বন্দুকের গুলি প্রচণ্ড বেগে ছুটে বের হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শব্দ হবে কি?

গুলি তো বের হলো, কিন্তু তুমি কি কোনো শব্দ শুনতে পাবে? না। একদম পিনপতন নীরবতা! শব্দ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য বাতাস বা পানির মতো কোনো মাধ্যম দরকার হয়। মহাকাশ তো সম্পূর্ণ শূন্যস্থান। সেখানে বাতাস নেই, তাই শব্দের কোনো তরঙ্গ তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারবে না। তুমি কেবল তোমার হাতে একটা ধাক্কা অনুভব করবে, কিন্তু কানের কাছে কোনো শব্দ হবে না। পুরো ঘটনাটা ঘটবে একটা সাইলেন্ট মুভির মতো!

গুলির গতিপথ

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই গুলিটি যাবে কোথায়? না মানে, পৃথিবীতে বন্দুক থেকে গুলি ছুড়লে তো তা নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। অবশ্য এর পেছনে বাতাসের বাধা এবং পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কাজ করে। কিন্তু মহাকাশে এই দুটি জিনিসের কোনোটিই নেই! তাহলে তোমার ছোড়া ওই ছোট্ট গুলির কী হবে? বিজ্ঞান বলছে, ওই গুলিটি হাজার হাজার বছর ধরে এক সরলরেখায় সামনের দিকে ছুটতেই থাকবে। এটি হয়তো অসীমকাল ধরে চলতে পারত, কিন্তু মহাকাশ তো আর পুরোপুরি খালি নয়। তথাকথিত এই শূন্যস্থানেও এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে কিছু মহাজাগতিক ধূলিকণা বা গ্যাসীয় পদার্থ। হাজার হাজার বছর ধরে চলতে চলতে এই অতি সামান্য ধূলিকণার ঘর্ষণে গুলিটির গতি একসময় ধীরে ধীরে কমে আসবে। অথবা কোনো গ্রহাণু, উপগ্রহ বা অন্য কোনো বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তবেই এর যাত্রার অবসান হবে।

তোমার কী হবে?

কিন্তু গুলিটির নাহয় একটা ব্যবস্থা হলো, তোমার কী হবে? বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রটা মনে আছে? ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে।’ তুমি যদি চাকার জুতো বা রোলার স্কেটস পরে সামনের দিকে ভারী কিছু ছুড়ে মারো, তাহলে দেখবে তুমি নিজে কিছুটা পেছনের দিকে পিছিয়ে যাবে। মহাকাশে ঠিক এই ঘটনাই ঘটবে তোমার সঙ্গে। তুমি যেহেতু শূন্যে ভাসছ, তাই গুলিটি যখন প্রচণ্ড বেগে সামনের দিকে ছুটে যাবে, তখন সেই গুলিটিও তোমাকে পেছনের দিকে একটা সমান ধাক্কা দেবে।

তবে গুলির মতো অত জোরে তুমি ছিটকে যাবে না। কারণ, গুলির ওজন খুবই কম, আর তোমার স্পেসসুটসহ ওজন অনেক বেশি। তুমি পেছনের দিকে প্রতি সেকেন্ডে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার বেগে ভাসতে শুরু করবে। কিন্তু সবচেয়ে মজার বা ভয়ের ব্যাপার হলো, তোমাকে থামানোর মতো কোনো বাতাস বা ঘর্ষণ সেখানে নেই। তাই তুমি এই ধীরগতিতেই অনন্তকাল ধরে পেছনের দিকে ভাসতেই থাকবে!

নিজের গুলিতে আঘাত?

এই পর্যায়ে এসে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন না করলেই নয়। আচ্ছা, তোমার ছোড়া গুলিতে তোমার নিজের ঘায়েল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা! মানে তুমি যে গুলিটি কিছুক্ষণ আগে মহাকাশে ছুড়ে দিলে, সেটি কি কোনোভাবে তোমাকে আঘাত করতে পারবে? আসলে তুমি যদি পৃথিবীর খুব কাছাকাছি কোনো কক্ষপথে ভাসতে ভাসতে গুলি ছোড়ো, তবে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে পারে। তুমি যেদিকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছ, ঠিক সেদিকেই যদি নিখুঁত নিশানায় গুলি ছোড়ো, তবে সেই গুলিটি পৃথিবীর চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে শুরু করতে পারে। আর তুমি যদি তোমার জায়গা থেকে একটুও না সরো, তবে পৃথিবী একবার ঘুরে আসার পর ওই গুলিটি পেছন থেকে এসে তোমার পিঠেই আঘাত করতে পারে!

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস