সংসদে আর্থিক খাতের নিয়োগ ও বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের কাজে লাগাতে বয়সসীমা শিথিল করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পারফরম্যান্স দেখার অপেক্ষা করতেও বলেন অর্থমন্ত্রী। অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকারের সাম্প্রতিক নিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। তবে সরকার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আর্থিক খাতে কোনও রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হবে না এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিল পাস ও বিরোধীদের আপত্তি
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৫তম দিনে স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাত্বে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী দুটি বিল পাস হয়। বিল দুটি পাসের ক্ষেত্রে আপত্তি জানায় বিরোধী দল ও ১১ দলীয় জোট। এদিন সংসদে পাস হওয়া বিল দুটি হচ্ছে— ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন (সংশোধন) ২০২৬’ এবং ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল ২০২৬’।
বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন
বিদ্যমান আইনে, কোনও ব্যক্তি ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ করলে তাকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগের অযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয় বা তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিলটি পাস হওয়ায় বিধানটি বিলুপ্ত হচ্ছে। অপরদিকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আইনে বলা আছে, ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হলে কোনও ব্যক্তি বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারেন না। বিলটি পাস হওয়ায় এই বিধানও বিলুপ্ত হচ্ছে।
সরকারের যুক্তি
দুটি বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত পৃথক বিবৃতিতে বলা আছে, অভিজ্ঞ, দক্ষ ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে আইনগুলো সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী বলেন, “১৯৯৩ সালে যখন আইনটি করা হয়, তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৭ বছর। বর্তমানে তা বেড়ে ৭২ বছরে দাঁড়িয়েছে। যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজে লাগানোর জন্যই এই সংশোধন প্রয়োজন। বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের আকৃষ্ট করতে আমরা কাজ করছি।”
বিরোধী দলের সমালোচনা
তবে বিরোধী দল বলছে রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো বিল দুটি পাস হওয়ায়। বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের সমালোচনা করা হয়। সমালোচনা করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও। বিল দুটি উত্থাপনের দিন বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুটি বিল নিয়েই সমালোচনা করে বিরোধী দল। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমাদের অধিকার খর্ব করবেন না। আমাদের অধিকার আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে সংরক্ষিত হোক। এই বিল দুটিই স্থগিত করেন। যে দুটির কাগজ আজই সরবরাহ করা হয়েছে। বেশিরভাগ সংসদ সদস্য আমরা এখানে নতুন এসেছি। আমরা বিধি আস্তে আস্তে রপ্ত করছি। বিধি মোতাবেক এই সংসদ চলবে— সবারই সহযোগিতা করা উচিত।”
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ এই বিলটা কোনও সময়সীমার মধ্যে বন্দি নয়। এখানে সময়ের কোনও বাধ্যবাধকতা নাই। বিধিটা মানাই উচিত ছিল। আমরা তিনদিন আগে চেয়ে একদিন আগেও পেলাম না, মেটেরিয়ালস। জাস্ট এখন ডেস্কে এসে পেয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “যোগ্য লোকদেরকে যোগ্য জায়গায় স্পেস করে দেওয়া দরকার। কিন্তু একটা কথা আছে যে, বৃক্ষ তোমার পরিচয় ফলে। সরকারের দুই মাসের যেসব কার্যকলাপ বেসিক জায়গাগুলোতে হাত দেওয়া, প্রতিটি জায়গায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে, যে কাজটা করা হয়েছে, সাবেক গভর্নরকে বিদায় দেওয়ার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, জাতি এটা দেখেছে।”
অর্থমন্ত্রীর জবাব
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যাখা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “আমার বক্তব্যে আমি পরিষ্কার করেছি এই বিলগুলো কেন আনা হয়েছে। এই বিলটা যখন ৯৩-তে হলো, তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর। এখন গড় বয়স ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বাংলাদেশের এই নাগরিকগুলোকে, অভিজ্ঞ লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান?” অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে যেখানে সফলভাবে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে, সফলভাবে। যোগ্য ব্যক্তিদের কাজ করার ক্ষেত্রে সেটা (বয়সের সীমাবদ্ধতা) আমরা চাচ্ছি না। সেটা বীমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য— সেটা যেকোনও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ খারিজ
অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলোর যদি প্রেসিডেন্ট দেখেন, যতবার (বিএনপি) সরকারে এসেছে— বাংলাদেশ ব্যাংক, এক্সচেঞ্জ কমিশনের যতগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছে, সবগুলো নন-পলিটিক্যাল। আমি ক্লিয়ারলি বলতে চাই এবং যেই কারণে বাংলাদেশে আর্থিক শৃঙ্খলা বিএনপি সরকারের সময় কোনও সমস্যা হয় নাই। সবসময় আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে, কোনও সময় শেয়ার বাজার লুটপাট হয় নাই? বিকজ বিএনপির অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো কোনও সময় পলিটিক্যাল কনসিডারেশনে হয় নাই। যোগ্য ব্যক্তিদের সেখানে দেওয়া হয়েছে— সেই ধারা এই সরকার অব্যাহত রাখবে, আমি আপনাকে নিশ্চিতভাবে বলতে চাই।” বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “গভর্নর কোনও দলের ব্যক্তি নয়, সে একটা দলের সমর্থক হতেই পারেন। কিন্তু তার যদি যোগ্যতা থাকে তার অ্যাপয়েন্টমেন্টের অসুবিধাটা কোথায়?”
স্বতন্ত্র সদস্যের বক্তব্য
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, “কোনও বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কী এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগের বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে কিনা, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।” তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, “২০০১ সালে বিএনপি সরকার নিজেদের পছন্দের লোককে উপদেষ্টা করার জন্য প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়িয়েছিল, যার খেসারত জাতিকে দীর্ঘকাল দিতে হয়েছে। শেয়ার বাজারের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় নিজেদের লোক বসানোর চিন্তায় যদি বয়সের সীমারেখা তুলে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।”
রুমিন ফারহানার বক্তব্য
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল’ পাসের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশের আমদানি-রফতানি পরিস্থিতি সংকটে এবং পুঁজিবাজারের ওপর মানুষের আস্থা নেই।” এই পরিস্থিতিতে শেয়ার বাজারকে আস্থার জায়গায় ফেরাতে বিএসইসিতে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শাহজাহান চৌধুরীর আপত্তি
একই বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বিলে লুটপাটের শাস্তি মাত্র ৫ বছর জেল এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা রাখায় আপত্তি জানান। এছাড়া বিএসইসির সদস্যদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দেন তিনি। তবে লিখিত প্রস্তাব না থাকায় ডেপুটি স্পিকার তা গ্রহণ করেননি।
উপসংহার
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আর্থিক খাতে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো সুযোগ থাকবে না। বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট মহল সন্দেহ প্রকাশ করলেও অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানে কাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, সেদিকে নজর রাখবে জাতি।



