মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় দেড় বছর হতে চললেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করায় জামিন চেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই তিন আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছেন। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, অগ্রগতি প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাঁদের জামিনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
আদালতের নির্দেশ
আজ রোববার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আগামী ২৬ জুলাই অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, মো. আব্দুর রাজ্জাক, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, গোলাম দস্তগীর গাজী ও শাজাহান খান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সোলাইমান সেলিম, সাবেক সচিব মো. জাহাংগীর আলম ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
শুনানিতে প্রসিকিউশনের বক্তব্য
ট্রাইব্যুনালে আজ শুনানিতে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী) এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন মাস সময় চায়। ট্রাইব্যুনাল সময় মঞ্জুর করে আগামী ২৬ জুলাই প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন।
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর জামিন আবেদন
এরপর তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর আইনজীবী শেখ আলী আহমেদ খোকন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ট্রাইব্যুনাল বিচারের যেকোনো পর্যায়ে আসামির জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। তারপরও এক বছরের মধ্যে আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করলেও জামিন দেওয়ার সুযোগ থাকে। দেড় বছর ধরে এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন তাঁর মক্কেল। তৌফিক-ই-ইলাহী আওয়ামী লীগের কোনো সদস্য ছিলেন না। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর উপদেশ সরকার মানতেও পারে, না-ও পারে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তৌফিক-ই-ইলাহী উসকানি দিয়েছেন বা কোনো ধরনের ভূমিকা পালন করেছেন, এমন কোনো ছবি, অডিও কিংবা ভিডিও নেই। ১৪–দলীয় জোটের বৈঠকেও তিনি ছিলেন না। এ অবস্থান তুলে ধরে তিনি তাঁর মক্কেলের জামিন চান।
কামাল আহমেদ মজুমদারের জামিন আবেদন
পরে কামাল আহমেদ মজুমদারের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, তাঁর মক্কেল দেড় বছর ধরে কারাগারে আছেন। এখনো তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। তাঁর মক্কেল হাসপাতালে শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় কামাল আহমেদের জামিন চান এই আইনজীবী।
দীপু মনির জামিন আবেদন
দীপু মনির আইনজীবী সিফাত মাহমুদ বলেন, ১ বছর ৫ মাস ধরে তাঁর মক্কেল এই মামলায় কারাগারে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় তিনি দীপু মনির জামিন চান।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
এই তিন আসামির বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এই মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখে (২৬ জুলাই) তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, দীপু মনি ও কামাল আহমেদ মজুমদারের বিষয়ে ‘প্রোগ্রেস রিপোর্ট’ (অগ্রগতি প্রতিবেদন) দাখিল করতে হবে। তখন তাঁরা জামিনের বিষয়টি ‘সিরিয়াসলি’ (গুরুত্বের সঙ্গে) দেখবেন।
‘প্রোগ্রেস রিপোর্ট’ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আসামিদের বিষয়ে তদন্তের কত দূর অগ্রগতি বা তদন্ত কী পর্যায়ে রয়েছে, সেই প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
জামিনের আইনি ভিত্তি
এখন কেন ট্রাইব্যুনাল এমন প্রতিবেদন দিতে বলছেন, জানতে চাইলে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, বাধ্যতামূলক নয়, তবে সাধারণ নিয়ম হচ্ছে যদি কেউ গ্রেপ্তার হন, তার এক বছরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হয়। তাঁদের জামিন আবেদনের অন্যান্য কারণের মধ্যে একটি হলো এক বছর পার হওয়ায় তাঁরা জামিন চেয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল আরও ছয় মাস সময় দিতে পারেন।
ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধিতে বলা হয়েছে, যদি কোনো আসামি তদন্ত চলাকালে হেফাজতে থাকে, তবে বিধিমালার অধীনে তাঁর গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে এক বছরের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত সম্পন্ন করবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে, ট্রাইব্যুনাল কিছু শর্ত সাপেক্ষে আসামিকে জামিনে মুক্তি দিতে পারবেন। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, ট্রাইব্যুনাল লিখিতভাবে কারণ উল্লেখ করে তদন্তের সময়সীমা এবং আসামিকে হেফাজতে রাখার আদেশ আরও ছয় মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারেন।



