কাস্টমস কর্মকর্তা হত্যা: স্ত্রীর বিলাপ, ‘আমার স্বামীকে কেন হত্যা করা হলো’
কুমিল্লার আলোচিত কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) হত্যাকাণ্ডে শোক ও ক্ষোভে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। পৈশাচিক এই হত্যার কারণ এখনো অজানা থাকায় পরিবার ও স্বজনদের পাশাপাশি নগরীর সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে প্রশ্ন—কেন তাকে হত্যা করা হলো?
নিহতের স্ত্রী উর্মি হীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে বারবার একই প্রশ্ন করছেন, ‘আমার স্বামীকে কেন হত্যা করা হলো? তার তো কোনো শত্রু ছিল না।’ স্বামীর লাশের সামনে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। পাশে থাকা স্বজনরাও তাকে সান্ত্বনা দিতে ব্যর্থ হন। এতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) দুপুরে কুমিল্লা নগর উদ্যানের পাশে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ে মরদেহ নেওয়া হলে সহকর্মীরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান প্রিয় সহকর্মীকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও সন্তানসহ বসবাস করতেন বুলেট বৈরাগী। সহকর্মী ও স্থানীয়দের কাছে তিনি শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার বিবরণ
স্ত্রী উর্মি হীরা জানান, তার স্বামী চট্টগ্রামে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে ছিলেন। নিয়মিত সপ্তাহ শেষে কুমিল্লায় ফিরতেন। ঘটনার দিন তিনি চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই ঘুরে রাত ১১টার দিকে বাসে করে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন। তিনি আরও জানান, রাতের দিকে একাধিকবার ফোনে কথা হলেও পরবর্তীতে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপরই পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে বুলেট বৈরাগীর লাশ পাওয়া যায়। লাশের মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল বলে জানা গেছে।
পরিবারের ধারণা, তিনি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী।
নিহতের পরিচয়
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর একমাত্র সন্তান। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দেন এবং কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির কারণে কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। বিবিরবাজার থেকেই তিনি ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে ৪৪তম মৌলিক প্রশিক্ষণে যান।
মায়ের বক্তব্য
বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, ‘আমার স্বামী কৃষক ছিলেন। অনেক কষ্টে ছেলেটাকে বড় করেছি, ভালো মানুষ বানিয়েছি। শুক্রবার দিনগত রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে কথা হয় বুলেটের সঙ্গে। তখন সে বলল, বাসে আছি, কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফিরব। এর কিছুক্ষণ পর কল দিলে আর রিসিভ হয়নি। এরই মধ্যে আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। একের পর এক কল দিতে থাকি। সর্বশেষ ভোর পৌনে ৪টার দিকে কলটি রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ঘুমাচ্ছি, আরেকটু পরে আসছি। তখনই বুঝেছি, আমার ছেলের সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে। কারণ এটা আমার ছেলের ভাষা না। ওই সময়ই মনে হচ্ছিল, রাত ২টা ১০ মিনিটে তাহলে কি আমি অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেছি? অনেক খোঁজাখুঁজির পর শনিবার দুপুরে শুনি, আমার সোনার ছেলেটার লাশ রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে।’
সন্তানের জন্মদিন পালন করা হলো না
২০২২ সালের ২২ এপ্রিল বুলেট বৈরাগী ও উর্মি হীরার বিয়ে হয়। চলতি সপ্তাহেই ছিল তাদের তৃতীয় বিবাহবার্ষিকী। এ দম্পতির একমাত্র সন্তান অব্যয় বৈরাগীর বয়স এক বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল ২৭ এপ্রিল। পরিবার জানায়, সন্তানের জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের জন্যই তিনি শেষবারের মতো কুমিল্লার পথে রওনা দিয়েছিলেন।
তদন্তে পুলিশ
ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ কাস্টমস অফিসে নেওয়া হলে সহকর্মীরা শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ পাঠানো হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘এটি একটি হত্যাকাণ্ড। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই হত্যার কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।’
এদিকে হত্যার কারণ এখনো উদঘাটিত না হওয়ায় পুরো ঘটনায় শোকের পাশাপাশি উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।



