প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার (২৭ এপ্রিল) যশোরে আসছেন। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তার বাবা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে শার্শার বেতনা নদীর সংযোগ উলাসী-যদুনাথপুরে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খননের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। পাঁচ দশক পর বাবার দেখানো পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান। উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি
দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনসহ আরও কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। তার কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে যশোর মেডিক্যাল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন ও যশোর ঈদগাহে জেলা বিএনপির জনসভায় ভাষণ দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। সফর ঘিরে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রত্যাশায় স্বপ্ন দেখছেন নেতাকর্মীরা।
বাবার স্মৃতিবিজড়িত খাল পুনঃখনন
৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে মাটি কেটে শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ উলাসী-যদুনাথপুরে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নেন সাধারণ মানুষ। ছয় মাসে খাল খনন সফল হয়। ছয় মাস পর ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন উলাসী গ্রামের বাসিন্দা শতবর্ষী আবদুল বারিক মণ্ডল। সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে এসে স্কুল মাঠে নেমেছিলেন। হেঁটে এসে নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়িতে দেন। সেই ঝুড়ি আমার ভাই করিম বকস মণ্ডল মেম্বারের মাথায় তুলে দেন রাষ্ট্রপতি। আমার ভাইয়ের মাথার টোকা (মাথাল) রাষ্ট্রপতি নিজেই পরে নেন। সেদিন খাল কাটা উদ্বোধনে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। পরে বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও খাল কাটার কাজে অংশ নেন।' তিনি বলেন, 'হাজার হাজার মানুষ বিনা টাকায় খাল কাটার কাজে অংশ নেন। যারা কাজ করতেন, তাদের শুধু দুপুরে রুটি আর গুড় খাওয়ানো হতো। খালের পাড়ে অফিসের ওখানে রুটি তৈরি করা হতো। সেই রুটি খেয়েই সবাই মাটি কাটার কাজ করেছি। রাষ্ট্রপতিকে ভালোবেসেই মানুষ খাল কাটতে নেমে পড়েছিলেন।'
আবদুল বারিক মণ্ডল বলেন, 'উত্তর শার্শার ৫টি বড় বিলের পানি ঠিকমতো সরত (নিষ্কাশন) না। এজন্য হাজার হাজার বিঘা জমিতে আবাদ হতো না। বেতনা নদীর পানি বের না হওয়ায় একটা আবাদ মার যেত। এলাকার মানুষের খুবই অভাব হতো। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর উলাসীতে বেতনা নদীর সঙ্গে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেন। তার সেই উদ্যোগে ঠিকমতো পানি সরা শুরু হলো। খালের পানি সেচের কাজে ব্যবহার করে আমরা উপকার পেতে শুরু করলাম। এ অঞ্চলে আবাদ ব্যাপক বৃদ্ধি পেল। আমাদের অভাব দূর হলো। দীর্ঘদিন খাল সংস্কার না হওয়ায় অনেক জায়গায় ভরাট হয়ে গেছে। ফের খাল খনন করে পানি বের হওয়া সহজ করতে হবে। তাহলেই মানুষের উপকার হবে।'
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনীতে জনপ্রতিনিধি বাবার সঙ্গে গিয়েছিলেন ১৪ বছর বয়সি আবু বক্কর সিদ্দিকী। বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সি আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, 'আমার বাবা করিম বকস মণ্ডল ইউপি মেম্বার ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়ি আমার বাবার মাথায় তুলে দিয়েছিলেন। বাবা প্রথম ঝুড়ি মাটি মাথায় করে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্রপতি নিজেই মাটি কেটে খাল খনন উদ্বোধন করেছেন-এই বার্তাটি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য খাল খনন খুবই দরকারি ছিল।'
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, 'উলাসী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্ভে শেষে প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয়সহ নকশা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর টেন্ডার আহ্বান করা হবে। আশা করছি মৃতপ্রায় খালটি প্রাণ ফিরে পাবে।'
প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন বলে জানালেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। তিনি বলেন, 'দীর্ঘ ৫০ বছরে উলাশী-যদুনাথপুর খাল সংস্কার না করায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সেই খাল পুনঃখনন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৫০ বছর আগে জিয়াউর রহমানের নিজে হাতে কোদাল নিয়ে খনন করা সেই খালটি পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনে আগামী ২৭ এপ্রিল আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমরা সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।'
জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সফল করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার আগমনের মধ্য দিয়ে যশোর উন্নয়নের চাকা সচল হবে।'
একগুচ্ছ দাবি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে একগুচ্ছ দাবিতে সোচ্চার নেতারা। দাবির মধ্যে রয়েছে যশোর সিটি করপোরেশন ঘোষণা, যশোর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ও কিডনি ডায়ালোসিস সেন্টার চালু, ভোরবেলা বেনাপোল থেকে যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে আরও একটি আন্তঃনগর ট্রেন এবং দর্শনা (গেদে সীমান্ত) থেকে যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে দুইটি আন্তঃনগর ট্রেন দিতে হবে। ঢাকা-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল বা দর্শনা সীমান্ত রুটে অন্তত একটি লোকাল ট্রেন চালু। দর্শনা থেকে খুলনা পর্যন্ত ডবল লাইন রেলপথ চালু; সুবিধাজনক যে কোন স্টেশনে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) স্থাপন ও সকল আন্তঃনগর ট্রেনে সাধারণ বগি যুক্ত করার প্রস্তাব।
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ যশোর শাখার সাধারণ সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, 'যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা জেলার লোকজন চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। চিকিৎসাসেবা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। করোনাকালীন এখানে স্থানীয়ভাবে ১০ শয্যার অপূর্ণাঙ্গ আইসিইউ চালু করা হয়। হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউর সমস্ত যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন পড়ে আছে। এর প্রধান কারণ আইসিইউ পরিচালনার জন্য কোনও জনবল নিয়োগ করা হয়নি। ফলে চিকিৎসা সুবিধা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। অপরদিকে মূল্যবান যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালে একটি কিডনি ডায়ালোসিস সেন্টার অনুমোদন দেওয়া হলেও তা চালুর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে জেলার ৩১ লাখ মানুষসহ পার্শ্ববর্তী চার জেলার ৭০ লক্ষাধিক মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন।'
যশোর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির নেতা অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত যশোর বাংলাদেশের কৃষি ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ধান, পাট, তেলবীজ, খেজুর গুড়ের পাশাপাশি সবজি উৎপাদনে যশোর অনন্য। ঝিকরগাছার গদখালির বাণিজ্যিক ফুল উৎপাদন দেশের ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। চাঁচড়ার রেণু পোনা উৎপাদন দেশব্যাপী মৎস্য চাষিদের কাছে সুপরিচিত। গবাদি পশুপালন ও পোলট্রিশিল্পের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এসব ঘিরে যশোর জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সময়ের দাবি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের সূতিকাগার হিসেবে ভূমিকা রাখবে।'



