চট্টগ্রাম নগরে রোগী পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্সে বাড়তি ভাড়া দাবিকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির লোকজনের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়েছে। এতে এনসিপির দুই নেতা আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দলটি। তবে ধস্তাধস্তিতে নিজেদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে সমিতি।
ঘটনার বিবরণ
আজ রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পূর্ব গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে দুই পক্ষ পূর্ব গেটের দুই পাশে অবস্থান নেয়। এ সময় হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়েছিল। বিকেল সোয়া পাঁচটার পর দুই পক্ষ সরে যায়।
আহত ও চিকিৎসা
ধস্তাধস্তিতে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আকবর আলী আশিক এবং সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাদাত আহত হয়েছেন বলে জানায় এনসিপি। তাঁরা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির অভিযোগ
এ ঘটনার প্রতিবাদে বিকেলে চমেক হাসপাতালের পূর্ব গেটে সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপি। এ সময় কিছু দূরে অবস্থান নেয় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নেতারা জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রোগী পরিবহনের বিষয়টি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছে। সমিতির সদস্যের বাইরে কিংবা অন্য কোথাও কোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেয় না। যদি কেউ প্রবেশ করে তাহলে তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন নেমে আসে। সমিতির লোকজন রোগী, রোগীর স্বজন ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের নানাভাবে হয়রানি করছেন।
এনসিপির নেতারা বলেন, এই কারণে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা দিয়ে সমিতির অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীর সদস্যরা। চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে জানিয়েও প্রতিকার পাননি তাঁরা।
নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির চট্টগ্রাম নগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে অনেকেই তাঁদের কাছে অভিযোগ করেন। তাই নিজেরাই ভুক্তভোগী সেজে আজ সকালে নোয়াখালী যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। এতে ভাড়া ধরা হয় ১২ হাজার টাকা। নির্ধারিত ভাড়া এর অর্ধেক। কয়েক দিন আগে ফেনীর জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া দাবি করা হয় ৯ হাজার টাকা। অথচ নির্ধারিত ভাড়া সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদ করলে সমিতির সদস্যরা তাঁদের ওপর হামলা করেন।
সিন্ডিকেটের পেছনে রাজনৈতিক নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ
এনসিপির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চমেক হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ইচ্ছা অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করার কোনো সুযোগ নেই। সমিতির নামে থাকা সিন্ডিকেটই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এই সিন্ডিকেটের পেছনে রাজনৈতিক নেতারা জড়িত। এ সিন্ডিকেট বাইরের কাউকে রোগী পরিবহন করতে দেয় না। এভাবে তো চলতে পারে না।
অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির বক্তব্য
হাতাহাতির ঘটনার পর হাসপাতালের পূর্ব গেটের বাইরে অবস্থান নিয়েছিল অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি। এনসিপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগ অস্বীকার করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ চৌধুরী।
অন্য অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল এক বছর আগে। এরপর ভাড়া সমন্বয় করা হয়নি। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অনেক দাম বেড়েছে। তাই আগের ভাড়ার তুলনায় তাঁরা এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি নেন। দুই-তিন গুণ বাড়তি ভাড়া নেন না।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি
ছয় দফা দাবি আদায়ে কর্মবিরতি পালন করছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন। আজ সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেছেন তাঁরা। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা চলছে। এ ছাড়া ওয়ার্ডের অভ্যন্তরেও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত আছে। তবে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা না থাকায় সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কর্মবিরতির কারণ
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এফসিপিএস ট্রেনিং-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেখানে ঢাকা মেডিকেল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কিছু বিভাগে নতুন পদায়ন বন্ধ, উপজেলায় দুই বছর বাধ্যতামূলক সেবাদান এবং মেধাভিত্তিক সীমিত ভাতার বিধান রাখা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে আন্দোলন চলছে।
আজ সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেছেন তাঁরা। পাশাপাশি একই দাবিতে বেলা ১১টার পর ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একাডেমিক ভবনের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এ সময় সেখানে দাবি আদায়ে নানা স্লোগান দেন তাঁরা।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বক্তব্য
ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন বলেন, ‘আমরা হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগের সেবা চালু রেখেছি, যাতে রোগীদের ভোগান্তি কম হয়। রোগীরাই আমাদের জীবনের অংশ, তাঁদের সেবার সঙ্গেই আমরা থাকতে চাই। আমরা সরকারকে এই বার্তা দিতে চাই, আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক এবং সেগুলো মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু এরপরও যদি সরকার আমাদের দাবির বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আমাদের কর্মসূচি আরও কঠোর হতে পারে।’



