জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে শূন্যরেখার ফসলি জমির আইলে কেউ বসে আছেন, কেউ আবার দাঁড়িয়ে। ধানের খেতে জমে আছে পানি। আর ভারতের অভ্যন্তরে বিএসএফ চাইনিজ রাইফেল নিশানা করে দাঁড়িয়ে আছে ওদের দিকে মুখ করে। অন্যদিকে পুশ-ইন ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে সশস্ত্র পাহারায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিজিবি। শূন্যরেখায় অমানবিক বিনিদ্র রাত্রিযাপন করছেন ভারতীয় নাগরিকরা। আর পতাকা বৈঠকের পরও রয়েছে অমীমাংসিত। পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখায় তিন দিন ধরে ধুঁকছে মানবতা।
পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বিএসএফের পুশ-ইনের চেষ্টার শিকার নারী-শিশুসহ ১০ জন এভাবেই রোববার তৃতীয় দিনের মতো ভারতের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে কাদাপানির মধ্যে অবস্থান করছেন। এদিকে পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশ-ইনের ঘটনায় গত ৩ দিনেও বিজিবি ও বিএসএফ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। বিজিবি ও বিএসএফের নিশ্ছিদ্র প্রহরায় তারা ভারতীয় শূন্যরেখার মধ্যে থেকেই মানবেতরভাবে দিনরাত অতিবাহিত করছেন।
রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিএসএফ ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থানকারী ১০ জনকে আবারও বাংলাদেশের শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি তাতে বাধা দেয়। এ সময় ওই সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে বিএসএফ তাদের নিয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়। বর্তমানে উভয়পক্ষই মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে রোববার নতুন করে কোনো পতাকা বৈঠক হয়নি। এ কারণেই অনিশ্চিতভাবে তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
রোববার দুপুরে বড়বাড়ি সীমান্তের বাংলাদেশের শূন্যরেখায় সরেজমিন দেখা গেছে, জেলা সদরের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকার ভারতীয় শূন্যরেখার জমির আইলেই এখনও পর্যন্ত অবস্থান করছে তিন শিশু, দুই নারীসহ ১০ জন। আইলের দুইপাশের জমিতে পানি জমে থাকায় তারা কোথাও নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারছে না। প্রখর রোদের মধ্যে অবস্থান করে অমানবিকভাবে দিন-রাত অতিবাহিত করছেন তারা।
তিন দিন ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাদাপানির মধ্যেই শুয়ে বসে আছেন। মাথার ওপর পলিথিন ধরে কোনোভাবে রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কোনো দেশের পক্ষ থেকে তাদের খাবার ও পানির ব্যবস্থাও করা হয়নি। সকালে বিজিবির পক্ষ থেকে খাবার পানি দেওয়ার চেষ্টা করলে বিএসএফ বাধা দেয়।
এদিকে পুশ-ইনের শিকার আব্দুস সালাম যুগান্তরকে বলেন, "আমাদের আনার সময় সঙ্গে করে যা এনেছিলাম তা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। কেউ আমাদের খাবার ও পানি দিচ্ছে না।" এমন নির্মম ও অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ সীমান্তের বাংলাদেশ প্রান্তের লোকজনও।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ভোরে পঞ্চগড় উপজেলা সদরের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৫৮-এর ৫নং সাব-পিলার এলাকা দিয়ে ওই ১০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় বিএসএফ তাদের শূন্যরেখার আবাদি জমির আইলেই আটকে রাখে। এখন পর্যন্ত তারা সেখানেই অবস্থান করছে। এরই মধ্যে সীমান্তের উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
বিজিবির নীলফামারী ৫৬ ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম ১০ জন ভারতীয় নাগরিককে পুশ-ইনের ঘটনাকে অত্যন্ত অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি উল্লেখ করে বলেন, "যেহেতু তারা ভারত থেকে এসেছে এবং বর্তমানে ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থান করছে; তাই তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বা গ্রহণও করা হবে না।" তিনি বলেন, "যদি কোনো নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে থেকে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে ইমিগ্রেশন আইনে পুলিশের মাধ্যমে তাদের হস্তান্তর করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বিএসএফ অবৈধভাবে পুশ-ইন করা হলে তা বিজিবি মেনে নেবে না।"
ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্ত
এছাড়া ৪৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে বিএসএফের পুশ-ইনের শিকার ১১ ব্যক্তির ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে দুই দফা পতাকা বৈঠকের পরও কোনো সমাধান মেলেনি।
জানা গেছে, শনিবার ভোরে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১১ জনকে ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাৎক্ষণিকভাবে ওই পুশ-ইন প্রতিহত করলে তারা দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখার কাছে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। এরপর থেকেই খোলা আকাশের নিচে জীবনযাপন করছেন তারা।
পুশ-ইনের শিকারদের মধ্যে রয়েছেন ৩ জন পুরুষ, ৪ জন নারী ও ৪ জন শিশু। তাদের মধ্যে একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা এবং একজন শিশু প্রতিবন্ধী। প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন-রাত কাটাতে হচ্ছে তাদের। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অভাবে পরিস্থিতি ক্রমশই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
পুশ-ইনের শিকার শিশু রোজিনা আক্তার জানায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করার পর প্রায় ১২ দিন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এনে ছেড়ে দেয়। সে ভারতের একটি স্কুলের শিক্ষার্থী।
স্থানীয়রা জানান, সীমান্তের জমির আইলে বসে থাকা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানবিক কারণে আশপাশের গ্রামবাসীরা শুকনো খাবার ও পানি পৌঁছে দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকায় শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ও অসুস্থতার লক্ষণও দেখা দিয়েছে।
দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, "বিজিবির পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে অবৈধ পুশ-ইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী যথাযথ প্রমাণসহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হস্তান্তর করা হলে আমরা গ্রহণ করব। তবে কোনো ধরনের অবৈধ পুশ-ইন গ্রহণ করা হবে না।"



